শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে এসেছে এক বিপ্লব। এআই এখন শুধু তথ্য খোঁজার উপায় নয়, এটি হয়ে উঠেছে একাধারে গাইড, শিক্ষক, সহকারী ও গবেষণা সহযোগী। শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতাকে আরো কার্যকর ও সহজ করে তুলতে এআইয়ের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খসরু আহমেদ বলেন, ‘প্রথমদিকে চ্যাটজিপিটি শুধু মজা করে ব্যবহার করতাম। কিন্তু এখন বুঝি, আমি এ টুলটাকে আমার ভার্চুয়াল টিচার হিসেবেই দেখি। কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে প্রথমে এখানেই প্রশ্ন করি।’ এমন অভিজ্ঞতা এখন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর। এআইয়ের বিভিন্ন ব্যবহারিক দিক রয়েছে, যেগুলো শিক্ষার পরিধি ও প্রক্রিয়াকে বদলে দিচ্ছে দ্রুতগতিতে।
ব্যক্তিগত শেখায় সহায়তা: প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার গতি, আগ্রহ ও দুর্বলতা আলাদা। এআই এ পার্থক্যগুলো বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীর জন্য ব্যক্তিগত লার্নিং প্ল্যান তৈরি করতে পারে। যেমন কোনো শিক্ষার্থী অংকে দুর্বল, কিন্তু বিজ্ঞানে ভালো করছে; এমন ক্ষেত্রে এআই ওই ছাত্রকে বেশি অংকের অনুশীলন এবং সহজবোধ্য টিউটোরিয়াল সাজেস্ট করতে পারে। খান একাডেমি বা কোর্সেরার মতো অনেক অনলাইন প্লাটফর্ম এরই মধ্যে এআই-বেইজড পার্সোনালাইজড লার্নিং মডেল ব্যবহার করছে।
চ্যাটবট ও ভার্চুয়াল টিউটরদের ব্যবহার: চ্যাটজিপিটি, গুগল বার্ড বা মাইক্রোসফট কো-পাইলটের মতো এআই চ্যাটবট এখন শিক্ষার্থীদের ২৪/৭ প্রশ্ন করার সুযোগ দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা গণিত, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাসসহ যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন করে উত্তর পাচ্ছে সহজ ভাষায় এবং প্রয়োজন হলে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা সহকারে। এটি একটি ভার্চুয়াল টিউটরের মতো কাজ করছে, বিশেষ করে দূরবর্তী বা প্রাইভেট টিউশন সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন মৌ বলেন, ‘রাত ২টায়ও যদি আমি গণিতের কোনো সমস্যা নিয়ে আটকে যাই, তখন চ্যাটজিপিটিই আমার শিক্ষক। গণিতের ছবি তুলে দিলেই ব্যাখ্যাসহ বিস্তারিত চলে আসে নির্ভুলভাবে কোনো অংশ না বুঝলে সেভাবে প্রশ্ন করলে আবার উত্তর দেয়।’
নোটস তৈরি ও সারাংশ লেখায় এআই: শিক্ষার্থীদের অনেক সময় ক্লাসের লেকচার বা বইয়ের বড় বড় অধ্যায় থেকে মূল পয়েন্ট বের করে নোট তৈরি করতে হয়। এটি সময়সাপেক্ষ ও কঠিন কাজ হতে পারে। কিন্তু এআই টুল যেমন চ্যাটজিপিটি, Notion AI বা TLDR এ কাজটি দ্রুত করতে পারে। শিক্ষার্থী শুধু লেখাটি কপি করে দিলে, এআই তা থেকে মূল পয়েন্ট বের করে, সংক্ষেপে সারাংশ তৈরি করে দেয়। এটি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অনেক কাজে আসে।
প্রশ্ন তৈরি ও প্র্যাকটিস টেস্ট: প্রশ্ন তৈরি এখন আর শুধু শিক্ষকের কাজ নয়। শিক্ষার্থী নিজের পড়া বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে এআইয়ের মাধ্যমে কুইজ, এমসিকিউ, শর্ট কোয়েশ্চেনের সেট তৈরি করতে পারে। এটি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত কার্যকর। চ্যাটজিপিটি বা QuestionWell-এর মতো টুলস দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই মক টেস্ট বানাতে ও পরীক্ষা দিতে পারে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, ‘বিষয়বস্তু লিখে দিলে সম্ভাব্য কী কী প্রশ্ন হবে তার একটি শর্ট লিস্ট পাওয়া যায়। এখান থেকে ধারণা নিয়ে সে অনুযায়ী পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে খুবই সহায়ক এআই টুলস।’
ভাষা শেখায় এআই: বিদেশী ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এআই এখন এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। Duolingo, Memrise বা Babbe-এর মতো এআই-চালিত অ্যাপ্লিকেশন শিক্ষার্থীদের ভাষা শেখাচ্ছে গেমের মতো করে, যেখানে শেখার পাশাপাশি আনন্দও পাওয়া যায়। চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি কোনো বিদেশী ভাষায় কথোপকথন অনুশীলন করতে পারে। এতে উচ্চারণ, বাক্য গঠন ও শব্দভাণ্ডার দ্রুত উন্নত হয়।
অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন তৈরি: শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট, প্রতিবেদন বা প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, ভাষার গঠন, যুক্তি উপস্থাপন ও বানান সংশোধনে অনেক সময় লাগে। এআই টুল যেমন Grammarly, QuillBot বা চ্যাটজিপিটি এ কাজগুলো সহজ করে দিচ্ছে। রচনার কাঠামো সাজানো, প্যারাগ্রাফ ভাঙা, তথ্য যাচাই কিংবা ভাষা উন্নত করতেও এআই দারুণ ভূমিকা রাখছে। একটি লেখার বাক্যগত, ব্যাকরণগত দিকগুলো সহজেই সংশোধন করা যায়। কোন কোন জায়গায় কী কি শব্দগত ভুল বা কোন শব্দ ব্যবহার করা বেশি প্রাসঙ্গিক হবে সবই বলে দেয় এসব টুলস।
বিশ্লেষণ ও গবেষণামূলক কাজ: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যারা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য এআই এখন এক অপরিহার্য সঙ্গী। গবেষণা নিবন্ধ খুঁজে পাওয়া থেকে শুরু করে রেফারেন্স ম্যানেজমেন্ট, তথ্য বিশ্লেষণ, ডাটা ভিজুয়ালাইজেশন—সবই করা যায় Zotero, Research Rabbit বা চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে। পাশাপাশি ডাটা অ্যানালাইসিসের ক্ষেত্রে Python বা R-এর সঙ্গে এআই ইন্টিগ্রেশনও ব্যবহার হচ্ছে। একাডেমিক রিসার্চের জগতে এটি বড় ধরনের সুবিধা এনে দিয়েছে।