চলতি বছর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের পর্যটন কেন্দ্র থেকে সাদা পাথর লুটপাট নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। এর পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। চলতে থাকে অভিযান। তবে টাস্কফোর্সের চলমান অভিযানের মধ্যেই এবার সাদা পাথরের পর শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর লুট করছে একটি চক্র। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি রাতেই লুট হয় অর্ধকোটি টাকার পাথর।
স্থানীয়রা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরে শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর লুট চলছে। শাহ আরেফিন (র.)-এর মাজার খুঁড়ে চলছে পাথর উত্তোলন।
অবশ্য উপজেলা প্রশাসন বলছে, পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে টিলায় ব্যারিকেড দেয়া হয়েছে। যে রাস্তা দিয়ে পাথর পরিবহন করা হয়, সে রাস্তায় ট্রাক্টর আটকাতে দেয়া হয়েছে স্থায়ীভাবে লোহার পাইপের ব্যারিকেড। এছাড়া শাহ আরেফিন টিলার সঙ্গে সংযুক্ত সব রাস্তা এক্সক্যাভেটর দিয়ে কেটে দেয়া হবে। যাতে টিলা থেকে কোনো গাড়ি বের হতে না পারে।
পাথর উত্তোলন প্রাথমিকভাবে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিষয় হলেও তা পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পাথর উত্তোলন নদীর পরিবেশের আর জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তবে পাথর লুটপাটে সর্বদলীয় জোট ফের সক্রিয় হলেও খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, বিএমডির পক্ষ থেকে গত বছরের আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জগৎ জ্যোতি দাস। তিনি জানান, মামলার এজাহারে শাহ আরেফিন টিলার বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। তাছাড়া উপজেলা প্রশাসন থেকে বিএমডিকে অবহিত করে কয়েকটি চিঠি দেয়া হয়েছে।
জনশ্রুতি রয়েছে, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার একজন ছিলেন হজরত শাহ আরেফিন (রহ.)। প্রায় ৭০০ বছর আগে তিনি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জালিয়ারপাড় গ্রামের পাশে টিলায় বিশ্রামের জন্য আস্তানা গেড়েছিলেন। সেই থেকে এই টিলার নাম হয়ে যায় শাহ আরেফিন টিলা। অনেকেই এটাকে শাহ আরেফিনের মাজার বলেও ডাকেন। গত বছরের জুলাই পর্যন্ত মাজারসহ টিলার প্রায় ১০ একর অক্ষত ছিল। আগস্ট থেকেই শুরু হয় পাথর লুট।
গত ১০ নভেম্বর শাহ আরেফিন টিলা পরিদর্শনে আসেন সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। তিনি এ সময় বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে বন্ধ করা হবে শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলন। সেই সঙ্গে আইনের আওতায় আনা হবে দুষ্কৃতকারীদের।’
জেলা প্রশাসকের এমন হুঁশিয়ারির পর কিছুটা বন্ধ হয় পাথর উত্তোলন। পাথরের গর্ত থেকে উঠিয়ে নেয়া হয় লিস্টার মেশিন। তবে এর মধ্যেও ব্যতিক্রম ছিলেন দুই-চারজন। যারা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন অব্যাহত রেখেছেন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শাহ আরেফিন টিলার পাথর যাতে কেউ পরিবহন করতে না পারে সেজন্য আমরা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছি। তাছাড়া শাহ আরেফিন টিলার সঙ্গে সংযুক্ত সব রাস্তা এক্সক্যাভেটর দিয়ে কেটে দেয়া হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে ব্যারিকেডে তালা লাগানো হয়েছে। আনসার ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রয়োজনমতো তারা তালা খুলে গাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন।’
সরজমিনে দেখা গেছে, শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে রাস্তায় লোহার পাইপ দিয়ে ব্যারিকেড দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কের ভোলাগঞ্জ পয়েন্টে শাহ আরেফিনের রাস্তার সংযোগ স্থানে বসানো হয়েছে এ ব্যারিকেড। দুই পাশে লোহার খুঁটি ও ওপরে লোহার পাইপ দিয়ে বসানো ব্যারিকেড দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারবে। তবে বড় গাড়ি পার হতে হলে ওপরের লোহার পাইপ খুলে দিতে হবে। এজন্য সেখানে আনসার ও গ্রামপুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি রতন শেখ বলেন, ‘শাহ আরেফিন টিলার পাথর লুটকারীদের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। এর মধ্যে অন্তত ১৫ জনকে আটক করেছি। নতুন করে মামলা দেয়া হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’