গাজীপুর মহাসড়কের দুই পাশের ১০ মিটারের মধ্যে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা রয়েছে ৫৭৭টি। এর বাইরে সিএনজি স্টেশন, হাটবাজার, গার্মেন্ট ও শিল্প-কারখানা, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো আরো ২ হাজার ৭৬২টি স্থাপনা গড়ে উঠেছে এ ব্যস্ত মহাসড়কের কোলঘেঁষে। এছাড়া ফিডার রোড রয়েছে ১ হাজার ৭৬টি। হাইওয়ে পুলিশের দেয়া তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে ৪ হাজার ৪১৫টি স্থাপনার কারণে বিপৎসংকুল হয়ে উঠেছে গাজীপুরের মহাসড়ক। এতে প্রায়ই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা, যাত্রীরা পোহাচ্ছে যানজটের দুর্ভোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাসড়ককে নিরাপদ করতে এ ধরনের অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করার পাশাপাশি তা উচ্ছেদে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
আইন অনুযায়ী, মহাসড়কের দুই পাশে ১০ মিটার দূরত্বকে নিয়ন্ত্রণ রেখা ধরা হয়। ওই নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ, হাটবাজার বসানোসহ অন্যান্য কার্যক্রম করার বিধান নেই। এমনকি নিয়ন্ত্রণ রেখার বাইরে স্থাপনা নির্মাণ করতে হলেও নিতে হবে অনুমোদন। এছাড়া মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করার ক্ষেত্রেও অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মহাসড়ক আইনে বলা হয়েছে, অনুমোদন ছাড়া মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ, হাটবাজার বসানো বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। এর কোনো অংশ থেকে মাটি, বালি, পাথর বা সংশ্লিষ্ট কিছু উত্তোলন করা যাবে না। মহাসড়ক বা সংশ্লিষ্ট কোনো অংশে ময়লা, আবর্জনা বা অন্য কোনো বস্তু নিক্ষেপ বা রাখার বিধানও নেই। নির্মাণসামগ্রী রাখার ক্ষেত্রে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। পাশাপাশি মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করে সেগুলো উচ্ছেদ করার বিধান রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি মহাসড়কের মূল রাস্তার অন্তত ৩০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা থাকতে পারবে না।
২০০৯ সালের জুনে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের (পরে প্রধান বিচারপতি) নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রায়ে ২০১০ সালের মধ্যে দেশের সব সড়কযানে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা, সব ট্রাফিক সদর দপ্তরে গতি নিয়ন্ত্রক মনিটরিং ব্যবস্থা স্থাপনসহ আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি জিনাত আরার নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন। এতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০১-এর ৮ বিধি অনুযায়ী মহাসড়কের পাশে ১০ মিটারের মধ্যে স্থাপনা তৈরিতে অনুমতি দেয়ার বিধান বাতিলের আদেশ দেন। পাশাপাশি দেশের সব মহাসড়ক থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেরও আদেশ দেন।
আঞ্চলিক মহাসড়কের ভিত্তিতে কুমিল্লা, গাজীপুর, বগুড়া, মাদারীপুর, সিলেট ও খুলনা অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করছে হাইওয়ে পুলিশ। তাদের হিসাবে, দেশের জাতীয় মহাসড়কে ছোট-বড় মিলিয়ে সংলগ্ন স্থাপনা রয়েছে ৮ হাজার ৬১৫টি। এর মধ্যে মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে পড়েছে ১ হাজার ৩০০ অবৈধ স্থাপনা। এসব স্থাপনার মধ্যে টং ঘর, ভাসমান দোকান, আধাপাকা ও অস্থায়ী নানা ধরনের স্থাপনা রয়েছে। এ ধরনের অবৈধ স্থাপনা সবচেয়ে বেশি গাজীপুর মহাসড়কে।
৫৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়কের দুই পাশে ২ হাজার ৭৬২টি সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গার্মেন্ট ও শিল্প-কারখানা। এর মধ্যে কেবল গার্মেন্ট ও শিল্প-কারখানাই ২ হাজার ২২৪টি। এছাড়া হাটবাজার ১০৫, সিএনজি স্টেশন ১৩০ এবং স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা রয়েছে ১৪৬টি। এর বাইরে গাজীপুর মহাসড়কে ফিডার রোড রয়েছে ১ হাজার ৭৬টি। এসব প্রতিবন্ধকতা গাজীপুর মহাসড়ককে দুর্ঘটনাপ্রবণ করে তুলেছে। এতে প্রায়ই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি। পাশাপাশি বেড়েছে যানজটের দুর্ভোগ। মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য উঠে এসেছে হাইওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যানে। সেখানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়কে মোট ৪৩৭টি দুর্ঘটনা ঘটে। এ তিন মাসে দেশের মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫৬ জন। এর মধ্যে শিশু ১৫, নারী ৬০ ও বাকি ৩৮১ জন পুরুষ। গাজীপুর মহাসড়কেই ১৫৯টি দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১০১ জন। নিহত পুরুষ ও নারীদের অধিকাংশই কর্মজীবী। তারা মহাসড়ক সংলগ্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে চাপা পড়ে নিহত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক চার লেন মহাসড়ক নির্মাণ হলেও সীমানা নির্ধারণ বা রাস্তা থেকে স্থাপনা করার দূরত্ব চিহ্নিত করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে রাস্তার দুই পাশ দখলের সুযোগ থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার আশপাশের মহাসড়কের দুই পাশে শিল্প-কারখানা, দোকানপাট গড়ে ওঠা, রাস্তার পাশে গাড়ি পার্কিং, মানুষের চলাচল, ছোট-বড় গাড়ির অবাধ চলাচল, বিভিন্ন জায়গায় সংযোগ সড়কসহ ঘন ঘন বাস স্টপেজের কারণে মহাসড়কে ধীরগতি ও যানজটে পড়তে হচ্ছে দূরপাল্লার যানবাহনকে।
মহাসড়কসংলগ্ন স্থাপনাকে দুর্ঘটনার পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে অবস্থিত অবৈধ স্থাপনার মধ্যে হাটবাজার ঘিরে বরাবরই লোকসমাগম সৃষ্টি হয়। এসব স্থানে দুর্ঘটনা ঝুঁকির পাশাপাশি যানজটের সমস্যা সৃষ্টি হতে দেখা যায়। আবার কিছু স্থাপনা রয়েছে যেগুলো অবৈধ না, কিন্তু ওইসব স্থাপনা ঘিরে মহাসড়কে যাতায়াত প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। সেখানেও এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। নিরাপদ মহাসড়ক তৈরির লক্ষ্যে দ্রুত এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ প্রয়োজন।’
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (এইচআর অ্যান্ড মিডিয়া) মো. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের অধিক্ষেত্র এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থাপনার অবস্থান মহাসড়কের ১০ মিটারের মধ্যে। যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি এ ধরনের স্থাপনা দুর্ঘটনারও বড় কারণ। এর বাইরে মহাসড়কসংলগ্ন সিএনজি স্টেশন, গার্মেন্ট, শিল্প-কারখানা, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো আরো প্রায় ৩ হাজার ২০০ স্থাপনা রয়েছে। এগুলো বৈধ স্থাপনা। এসব স্থাপনার কারণে মহাসড়কে যান চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়। যেমন ধরেন মহাসড়কের পাশে একটি সিএনজি স্টেশন। সেখানে যাওয়ার জন্য রাস্তার উল্টো পাশের যানবাহন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে। এতে মহাসড়কে যান চলাচল যেমন বাধাগ্রস্ত হয় তেমনি বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।’
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর মহাসড়কের পর সবচেয়ে বেশি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে কুমিল্লা মহাসড়কে। রফতানিমুখী পণ্য পরিবহনে বেশি ব্যবহার হওয়া মহাসড়কটিতে ৮৪৫টি সংলগ্ন স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে সিএনজি স্টেশন ১৪৯টি, হাটবাজার ১৫৩, গার্মেন্ট ও শিল্প-কারখানা ১৩৭, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩১২ ও হাসপাতাল রয়েছে ৯৪টি। এছাড়া ৭৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়কে ফিডার রোড রয়েছে ১ হাজার ৬১টি। ৭৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ বগুড়া মহাসড়কে সংলগ্ন স্থাপনা রয়েছে ৫০৮টি। এর মধ্যে হাটবাজার ২২৯, শিল্প-কারখানা ২৫, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৮৪ ও হাসপাতাল রয়েছে ৭০টি। এর বাইরে বগুড়া মহাসড়কে ফিডার রোড রয়েছে ৭৮২টি। মাদারীপুর মহাসড়কে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে ১১৬টি। এর মধ্যে ১৮টি সিএনজি স্টেশন, হাটবাজার রয়েছে ৩৩, শিল্প-কারখানা ছয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩৩ ও হাসপাতাল রয়েছে ২৬টি। এর বাইরে ৩৮৩ কিলোমিটার মাদারীপুর মহাসড়কে ফিডার রোড রয়েছে ১৯০টি। সিলেট মহাসড়কে সিএনজি স্টেশন রয়েছে ২১, হাটবাজার ৪২, শিল্প-কারখানা ২৬, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৮৫ ও হাসপাতাল আটটি। এছাড়া খুলনা মহাসড়কে সিএনজি স্টেশন রয়েছে ১০, হাটবাজার ২৫, শিল্প-কারখানা ৩৬, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৬৭ ও হাসপাতাল রয়েছে ২২টি।