অর্ধশতাব্দীতেও স্বীকৃতি মেলেনি মোহাম্মদ কাবুলের

শহীদ কাবুলের বাবা গোলাম রসুল জীবনের শেষ ৩৮ বছর কাটিয়েছেন ছেলের স্বীকৃতির আশায়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সব দফতরে আবেদন করেও ফল পাননি। ২০০৯ সালে প্রায় ৯০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। এরপরও ছেলে আসিফ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বয়সে তরুণ। ভাষা উর্দু। উচ্চতা ছিল লম্বা। যুবকের চোখে-মুখে ছিল অদম্য তেজ। নাম মোহাম্মদ কাবুল আহম্মেদ। ছিলেন খেলোয়াড়। ফুটবলে ছিলেন দক্ষ। ব্যাডমিন্টনেও ছিল অসাধারণ প্রতিভা।

মাত্র আঠারো বছর বয়সেই তার জীবনে আসে বিয়ে। সংসার শুরু হলেও গুছিয়ে ওঠার সুযোগ হয়নি। ঠিক সেই সময়ই কানে আসে পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম ঘোষণা— ‘মানুষ চাই না, মাটি চাই’। কথাটি গভীরভাবে নাড়া দেয় কাবুলকে। ফুটবল মাঠের ক্ষিপ্রতার মতোই সিদ্ধান্ত নেন দ্রুত। উর্দুভাষী পরিবারে জন্ম নেয়া এ যুবক অবাঙালি হয়েও দেশের মুক্তির লড়াইয়ে অস্ত্র তুলে নেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চ কাবুল অন্য মুক্তিকামী যুবকদের সঙ্গে বগুড়া শহরের সুবিল ব্রিজ এলাকায় প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগ দেন। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে পরদিন (২৭ মার্চ) শহীদ হন কাবুল আহম্মেদ। যুদ্ধের পর তার ক্ষতবিক্ষত, বেয়োনেটের আঘাতে বিদ্ধ, গুলিবিদ্ধ ও অ্যাসিডে ঝলসানো লাশ উদ্ধার করেন বাবা গোলাম রসুলসহ স্থানীয়রা। দাফন করা হয় বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া দক্ষিণ বগুড়া গোরস্থানে। সেই কবর আজও কাঁচাই রয়ে গেছে।

কাবুল ছিলেন অবাঙালি—এ পরিচয়ই যেন তার আত্মত্যাগের স্বীকৃতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। বাঙালির জন্য অস্ত্র ধরেছিলেন বলেই পাকিস্তানি সেনারা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ গুমের চেষ্টা চালিয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও শহীদ কাবুল আহম্মেদের পরিবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কাবুলের জন্ম ভারতের উত্তর প্রদেশের বেনারসে। শৈশবেই বাবার সঙ্গে তিনি বগুড়ায় চলে আসেন। এখানেই পড়াশোনা। ১৯৬৭ সালে সেন্ট্রাল হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৯ সালে সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কলেজ জীবনে যুক্ত হন ছাত্র রাজনীতিতে। ছেলেকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে বিয়ে দেন বাবা, কিন্তু কাবুল বেছে নেন মুক্তিযুদ্ধের পথ।

কাবুল শহীদ হওয়ার পর তার স্ত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। একমাত্র ছেলে আনোয়ার আসিফকে মানুষ করেন দাদা গোলাম রসুল। আজ ঠনঠনিয়ায় তাদের ছোট্ট দোতলা বাড়ির নিচতলায় দোকান ভাড়া দিয়ে সংসার চালান শহীদ সন্তান আসিফ।

বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, কাবুল ছোটবেলা থেকেই সব খেলায় পারদর্শী ছিলেন। বিশেষ করে ব্যাডমিন্টনে তার বাহাতি স্ম্যাশ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২৬ মার্চ তিনি অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই সুবিল ব্রিজ এলাকায় প্রতিরোধ যুদ্ধে যান। পরদিন সন্তানের জামা দেখে লাশ শনাক্ত করেন বাবা।

শহীদ কাবুলের ছেলে আনোয়ার আসিফ জানান, দাদার কাছ থেকেই শুনেছেন যুদ্ধের গল্প। বাবার গল্প। তিনি জানান, উর্দুভাষী হওয়ায় তার বাবার নাম সরকারি গেজেটে ওঠেনি। মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নম্বর থাকলেও কোনো ভাতা বা রাষ্ট্রীয় সুযোগ মেলেনি। অথচ স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে শহীদ পরিবারের দাওয়াত কার্ড নিয়মিত আসে। ২০২৫ সালেও এসেছে।

কাবুলের যুদ্ধের ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন বইয়ে উল্লেখ থাকলেও বাস্তব স্বীকৃতি নেই। বগুড়ার বিজয়স্তম্ভে তার নাম রয়েছে। তার নামে একটি সড়কও নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি গেজেটে ওঠেনি তার নাম।

শহীদ কাবুলের বাবা গোলাম রসুল জীবনের শেষ ৩৮ বছর কাটিয়েছেন ছেলের স্বীকৃতির আশায়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সব দফতরে আবেদন করেও ফল পাননি। ২০০৯ সালে প্রায় ৯০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। এরপরও ছেলে আসিফ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এইবাংলার মাটিতে বেড়ে ওঠা, এখানকার মাঠে খেলা, এখানকার মানুষকে ভালোবেসে জীবন দেয়া এ অবাঙালি যুবকের পরিবার আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায়।

আরও