পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করে যাচ্ছে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল)। ২০০৩ সালে কোম্পানি হিসেবে যাত্রা করলেও এটির কার্যক্রম শুরু হয় মূলত স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে। ওই সময়ের ৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আশুগঞ্জ পাওয়ার এখন আরো বড় হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। পাশাপাশি আয় ও মুনাফায়ও ভালো প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে এ কোম্পানি। রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠানই যেখানে ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে, সেখানে আশুগঞ্জ পাওয়ার ঈর্ষণীয় পারফরম্যান্স দেখিয়ে চলেছে।
১৯৬৬ সালে জার্মান সরকারের অর্থায়নে ৩১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ১২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হয়। ১৯৭০ সালে এ ইউনিট দুটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যায়। ভৌগোলিকভাবে যাতায়াত ও বাণিজ্য সুবিধা থাকায় সেখানেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে তত্কালীন সরকার। পরে সেখানে আরো তিনটি ইউনিট স্থাপনে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। মেয়াদ শেষে প্রথম দুটি ইউনিট এরই মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা তৈরি হলে বিভিন্ন দেশের আর্থিক সহায়তায় সেখানে আগে থেকে করা তাপবিদ্যুতের তিনটি ইউনিট নতুন করে সম্প্রসারণ করা হয়।
বর্তমানে আশুগঞ্জ পাওয়ারের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৯ কোটি টাকায়। কোম্পানিটি ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে আয় করেছে ২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাবদ ব্যয় ছিল ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির পরিচালন আয় হয়েছে প্রায় ৮৬৮ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ২৫১ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে আগের বছরের তুলনায় এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমে গেছে।
গত পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে আশুগঞ্জ পাওয়ারের আয় ও মুনাফা দুটোই বেড়েছে। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় ছিল ৮৪১ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে শেষে ২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এপিএসসিএলের আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ পাঁচ বছরে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। অন্যদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ২৪ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে ২৫১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি।
আশির দশকের মধ্যভাগে আশুগঞ্জ পাওয়ারের তিনটি ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে সেখানে শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। ২০১০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে বিশেষ পরিকল্পনা করা হয়। এ সময় সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে আশুগঞ্জ পাওয়ার ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। এর পর থেকে কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে থাকে।
আশুগঞ্জে বিদ্যুতের বৃহৎ এ পরিকল্পনায় আর্থিক সহায়তা দেয় ব্রিটিশ সরকারও। যুক্তরাজ্যের আর্থিক সহায়তায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্টে রূপান্তর করা হয়। ৫৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি গ্যাস টারবাইন ও ৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্টিম টারবাইন নিয়ে কম্বাইন্ড সাইকেল প্লান্ট করা হয় দুটি ইউনিটকে। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৬ মেগাওয়াটে।
আশির দশকে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট প্রকল্পের ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের ডিজাইনার ও কমিশনিংয়ে দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ। এপিএসসিএলের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। আশুগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সে সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, এ অঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আশুগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। শুরুতে পাঁচটি দেশ আশুগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছিল। তাদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যয় এতটাই কম হয়েছিল যে উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে পরে আরো একটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে, এখনকার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি জানান, দেশে ইসিএ (এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি) ফাইন্যান্সিং ব্যবহার করে আশুগঞ্জে প্রথম ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে একইভাবে অর্থায়ন নিয়ে আশুগঞ্জে আরো দুটি ৪৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। মূলত আশুগঞ্জ পাওয়ার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী পরিকল্পনায় এটি সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া দেশে প্রথম কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যে ধারণা, সেটিও এসেছে আশুগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে। শুরুতেই এ প্রযুক্তি হোঁচট খেলেও পরে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো (আইপিপি) এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঈর্ষণীয় সফলতা পায়।
এপিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কোম্পানিটির আটটি ইউনিট চালু রয়েছে। সব মিলিয়ে এগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের কাছাকাছি হওয়ায় এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সিংহভাগ গ্যাসচালিত। কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। আটটি ইউনিটের মধ্যে একক হিসেবে সর্বোচ্চ ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্র রয়েছে আশুগঞ্জ পাওয়ারের।
এপিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এএমএম সাজ্জাদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, আশুগঞ্জ পাওয়ার এরই মধ্যে তা অর্জন করেছে। তবে বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি না হওয়ায় বর্তমান সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে ২৪ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে আশুগঞ্জ পাওয়ারের উৎপাদন সক্ষমতায় অবদান ৭ শতাংশ। আগামীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোম্পানিটি যেসব প্রকল্প গ্রহণ করেছে তা যথাসময়ে বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে কোম্পানিটির অংশগ্রহণ বাড়বে ১৫ শতাংশ।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ও সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে কোম্পানি আইনের অধীনে ২০০০ সালের ২৮ জুন প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় আশুগঞ্জ পাওয়ার। এরপর ২০০৩ সালের ১ মার্চ পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়। বিপিডিবি ওই বছরের ২২ মে ‘প্রভিশনাল ভেন্ডর এগ্রিমেন্টের’ মাধ্যমে এপিএসসিএলের কাছে সব ধরনের কার্যক্রম হস্তান্তর করে। শুরুতেই কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ টাকা, বর্তমানে তা ১ হাজার ২১৮ কোটি ৭৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৬৪ টাকা।
২০১৬ সালে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি মিশ্রণ বিবেচনায় যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, সেখানে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল এপিএসসিএল। তবে পরিবেশের নেতিবাচক বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে সরকার যে ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে, সেখানে আশুগঞ্জের প্রকল্পটি বাদ দেয়া হয়। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল কোম্পানিটির। তবে এ প্রকল্প বাতিল হওয়ায় এখন সেখানে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে এপিএসসিএল।
এদিকে এপিএসসিএল দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ১০০ মেগাওয়াট গ্রিড টারবাইন প্রকল্প ও পটুয়াখালীতে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিকল্পনাধীন রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ছাড়াও দুটি ৪০০ মেগাওয়াট ডুয়েল ফুয়েল সিসিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে আশুগঞ্জ পাওয়ার।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে বিদ্যুেসবার সম্প্রসারণ ও শিল্পায়নের পেছনে এপিএসসিএলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে আশুগঞ্জকে ঘিরে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল তা বাস্তব রূপ পেয়েছে। ফলে দেশ স্বাধীনের পর বিদ্যুৎ খাত নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয় আশুগঞ্জ পাওয়ার থেকে। মূলত সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার নেপথ্যে ছিল গ্যাসের প্রাপ্যতা ও নদীপথের ব্যবহার।
আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জার্মানির লেমেয়ার ইন্টারন্যাশনালকে আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা পর্যালোচনা শেষে কোম্পানিটি আশুগঞ্জে ১৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তিনটি ইউনিট স্থাপনে মতামত দেয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওই তিনটি ইউনিট নির্মাণে জার্মানি ও কুয়েতের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দেয় ওপেক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিভিন্ন দেশের আর্থিক সহায়তা থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রাংশও ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওই তিনটি ইউনিট নির্মাণে জেনারেটর যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে জার্মান কোম্পানি মেসার্স বিবিসি (বর্তমান নাম এবিবি), বয়লার সরবরাহ করে জাপানের আইএইচআই করপোরেশন। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে জাপানের মিত্সুই কোম্পানি। আশুগঞ্জ থেকে বিদ্যুৎ ঘোড়াশালে নিয়ে আসার জন্য সঞ্চালন লাইন নির্মাণে কাজ করে কোরিয়ান কোম্পানি মেসার্স লাকী ইন্টারন্যাশনাল।