গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থেকে টুঙ্গিপাড়া ৫৫ কিলোমিটার নতুন রেলপথ তৈরির কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালে। নির্মাণ করা হয় ছয়টি স্টেশন। তবে নির্মাণের পর একদিনের জন্যও ব্যবহার হয়নি চারটি স্টেশন। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে স্টেশনগুলোর বিভিন্ন মালপত্র। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্টেশন ভবনগুলোর বিভিন্ন কাঠামো। এমনকি ব্যবহার না হওয়ায় সেখানকার সিগন্যাল ব্যবস্থাও অকেজো হয়ে পড়েছে। স্টেশন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের জন্য নির্মিত স্টাফ কোয়ার্টারগুলোরও একই অবস্থা।
নির্মাণের পর ব্যবহার না হওয়া স্টেশনগুলো হলো কাশিয়ানী উপজেলার চাপতা ও ছোট বাহিরবাগ, গোপালগঞ্জ সদরের চন্দ্রাদিঘলিয়া ও টুঙ্গিপাড়ার বোড়াশী। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত জনবলের অভাবে স্টেশনগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ রেলওয়ে ২ হাজার ১১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কাশিয়ানী-গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়ার মধ্যকার নতুন রেলপথ এবং ছয়টি নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ করে। একই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজবাড়ীর কালুখালী থেকে গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত পরিত্যক্ত রেলপথ সংস্কার করা হয়। সংস্কার ও নতুন নির্মাণ করা রেল সেকশন দুটিতে স্টেশন আছে ১৯টি। এর মধ্যে ১৫টি স্টেশন বর্তমানে সচল থাকলেও চারটি স্টেশন একদিনের জন্যও ব্যবহার হয়নি।
কাশিয়ানী-টুঙ্গিপাড়ার মধ্যকার নতুন রেলপথ ও স্টেশন ভবনগুলো নির্মাণ করা হয় দুটি প্যাকেজের মাধ্যমে। কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে খরচ হয়েছে ১ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। মাঠ পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও তমা কনস্ট্রাকশন। রেলপথ, স্টেশনের সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য খরচ হয়েছে আরো ১০০ কোটি টাকা। বর্তমানে এ রেলপথ দিয়ে প্রতিদিন এক জোড়া ট্রেন পরিচালনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ট্রেনটি টুঙ্গিপাড়ার গোবরা থেকে রাজবাড়ী হয়ে রাজশাহী পর্যন্ত চলাচল করছে।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনেও স্টেশন বন্ধ থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবনির্মিত ও সংস্কার করা ১৯টি স্টেশনের মধ্যে কাশিয়ানী-গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া সেকশনের চারটি স্টেশন জনবলের অভাবে বন্ধ আছে। এমনকি স্টেশন ভবনগুলো নির্মাণের পর থেকে ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে ভবনে স্থাপিত গ্রিল, দরজা ও অন্যান্য মালপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চারটি স্টেশনের সিগন্যাল ব্যবস্থাও অকেজো হয়ে পড়েছে।
প্রতিটি স্টেশনে নির্মাণ করা হয়েছে তিনটি করে গ্যাংহাট বা স্টাফ কোয়ার্টার। স্টেশনগুলো চালু না হওয়ায় এসব অবকাঠামোও ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে স্টাফ কোয়ার্টারগুলো যেন এখন আগাছার দখলে এবং ভবনগুলোর জানালা, দরজা ও অন্যান্য অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু স্টেশন ভবন ও স্টাফ কোয়ার্টারই নয়, ব্যবহার না হওয়ায় সেখানকার সিগন্যাল ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে আইএমইডির প্রতিবেদনে।
অপরিকল্পিতভাবে কাশিয়ানী-গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া রেলপথ নির্মাণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বিনিয়োগের সাধারণ উদ্দেশ্য দুটি—যাত্রীসেবা ও রাজস্ব আয়। পুরো রেলপথে দিনে মাত্র একটি ট্রেন পরিচালনা করে কত টাকা আয় হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আবার বিপুল ব্যয়ে নির্মিত স্টেশনগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। এটা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।’
রেলওয়ের কর্মকর্তারা যদিও আশা করছেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনবল নিয়োগ করে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো চালু করা হবে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের অনেকগুলো স্টেশন এখন জনবলের অভাবে বন্ধ আছে। স্টেশনগুলো চালুর লক্ষ্যে এরই মধ্যে বেশকিছু জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। আবার নতুন করে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছি। আমরা আশা করছি, জনবল সংকট কাটিয়ে উঠে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব বন্ধ স্টেশন চালু করা সম্ভব হবে।’