বেকারত্বের সমস্যা সামনে আরো বড় আকার ধারণ করবে

বিডিজবসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) একেএম ফাহিম মাশরুর। শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, কর ব্যবস্থা, ব্যাংক খাত, উদ্যোক্তা অর্থায়নের সংকট ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাসহ দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার ‘অন্তর্দৃষ্টি’তে

শুরুতেই আপনার শৈশব, ছাত্রজীবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটা জানতে চাই।

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং আইবিএ থেকে এমবিএ করি। এরপর দুই-এক বছর করপোরেট চাকরি করলেও গতানুগতিক চাকরি আমার সঙ্গে মানানসই মনে হয়নি। তাই কয়েকজন বন্ধু মিলে নতুন কিছু করার চিন্তা করি। সময়টা ১৯৯৯-২০০০। দেশে তখন ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হচ্ছে। এখন যেমন এআই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন ইন্টারনেট ছিল তেমনি নতুন ও সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। মূলত শহরের তরুণরাই তখন মডেমের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করত।

ওই সময়ে ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিডিজবস শুরু করার কথা কীভাবে ভাবলেন?

আমরা বুঝতে পারছিলাম এ প্রযুক্তি অনেক কিছু বদলে দেবে। তাই তরুণদের কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করা যায় কিনা ভাবছিলাম। তখন চাকরিপ্রার্থীদের পত্রিকা বা লাইব্রেরি থেকে বিজ্ঞপ্তি খুঁজে সিভি প্রিন্ট করে ডাকযোগে পাঠাতে হতো, যা ছিল সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

এ সমস্যা থেকেই ‘বিডিজবস’ চালু করি, যাতে চাকরিপ্রার্থীরা এক জায়গায় সব তথ্য পায় এবং অনলাইনে আবেদন করতে পারে। শুরুতে কোম্পানিগুলোর অনলাইন বিজ্ঞাপনে আস্থা না থাকায় আমরা পত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ডাটা এন্ট্রি করতাম। প্রথম দুই-তিন বছর চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকারী—দুই পক্ষকেই বিনামূল্যে সেবা দিয়েছি। পরে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সাড়া পাওয়ার পর কোম্পানিগুলোকে কম খরচে অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়ার প্রস্তাব দিই।

প্রথম কোন কোম্পানির কাছে গিয়েছিলেন?

সুনির্দিষ্টভাবে প্রথম প্রতিষ্ঠানের নাম মনে নেই। তবে বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রামীণফোন ও বাংলাদেশ অক্সিজেন লিমিটেড শুরুতেই আমাদের সমর্থন দিয়েছিল। ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করলেও আয় আসতে প্রায় তিন বছর লেগেছিল। আমার বাসার ড্রয়িংরুমে একজন প্রোগ্রামার, একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ও একজন বার্তাবাহককে নিয়ে শুরু করি। মার্কেটিংসহ অনেক কাজ নিজেই করতাম। আয় শুরুর এক-দুই বছরের মধ্যে আমরা লাভজনক হই। পরবর্তী ১০-১২ বছর প্রায় ১০০ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল। বর্তমানে ব্যবসা পরিপক্ব হওয়ায় প্রবৃদ্ধি ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে।

আপনাদের প্রতিষ্ঠান কী ধরনের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে?

প্রথম ১৫-২০ বছর তেমন কোনো স্থানীয় প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হইনি। কিছু মিডিয়া হাউজ চেষ্টা করলেও তারা এ খাতে একনিষ্ঠ ছিল না। তবে গত পাঁচ-সাত বছরে ফেসবুক ও লিঙ্কডইনের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ বেড়েছে। এসব বৈশ্বিক প্লাটফর্মের সঙ্গে কিছুটা প্রতিযোগিতা থাকলেও দেশীয় বাজার সম্পর্কে গভীর ধারণার কারণে আমাদের সরাসরি স্থানীয় প্রতিযোগী নেই।

বাংলাদেশে প্রধান সমস্যাটি কোথায়? চাকরির অভাব, নাকি দক্ষ মানুষের অভাব?

আমরা মূলত স্নাতক বা কর্মকর্তা পর্যায়ের চাকরির বাজার কাভার করি। কৃষি বা প্রান্তিক অনানুষ্ঠানিক খাতের তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমাদের বড় সংকট শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, সামগ্রিক বেকারত্ব ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ হলেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাস তরুণদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক চাকরি পাচ্ছে না, এটা খুব উদ্বেগের বিষয়। দেশে শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি।

এর প্রধান কারণ গত ১৫-২০ বছরে শ্রমশক্তিতে স্নাতকদের সংখ্যা হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে। ২০০০ সালে মোট শ্রমশক্তির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল স্নাতক, অথচ ২০২০-২১ সালে তা দাঁড়ায় প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশে। এত স্নাতক হঠাৎ কীভাবে বাড়ল? চাকরির চাহিদা বাড়ার কারণে কি? বিষয়টি কিন্তু তা না। মূল কারণ হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়া। বর্তমানে প্রায় ২,১০০-২,২০০টি কলেজ রয়েছে, যার অধিকাংশই তৈরি হয়েছে গত ১৫ বছরে। উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি কলেজ হওয়ায় পড়ালেখার খরচ ও তদারকি কমে গেছে। শিক্ষার্থীরা সহজেই সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে না।

বর্তমানে প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসা ২১-২২ লাখ তরুণের মধ্যে প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত লাখই স্নাতক। সরকারি বা পাবলিক ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৮০ হাজার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় এক লাখ, কিন্তু এর মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ আসে এসব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজ থেকে। বেকারত্বের হার এ গ্রুপটাতেই সব থেকে বেশি। ডিগ্রি পাওয়ার পর সামাজিক মর্যাদার কারণে তারা কৃষিকাজ বা কারখানার সাধারণ শ্রমিকের কাজ করতে পারছে না, ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।

সমাধানের উপায় কী?

সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের কথা বললেও এর সহজ সমাধান নেই। বেকারত্বের সমস্যা সামনে আরো বড় আকার ধারণ করবে। প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিদেশে গেলেও তাদের ৯০ শতাংশ কম শিক্ষিত এবং মূলত মধ্যপ্রাচ্যে নিম্ন আয়ের কাজে যায়। আমাদের উচিত ১৮-২০ বছর বয়সী তরুণদের বাছাই করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা। গত বছর নেপাল থেকে প্রায় এক লাখ মানুষ জাপানে গেলেও বাংলাদেশ থেকে গেছে মাত্র ১০-১২ হাজার।

প্রচুর অর্থ ব্যয় করে স্নাতক তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। সরকার দেশে ভর্তুকি না দিয়ে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য তরুণদের ঋণ দিতে পারে, যাতে তারা দক্ষতা অর্জন করে সেখানেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। বৈশ্বিক চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সিলেবাসের সামঞ্জস্য নেই। স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোর বর্তমান মডেলও কার্যকর হয়নি; আমাদের জরিপ বলছে, এভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার প্রথম প্রভাব কাদের ওপর পড়বে?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এআইয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব আগে পড়বে কর্মকর্তা বা হোয়াইট কলার চাকরির ওপর। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর প্রভাব দেখা যাবে। সাধারণ শারীরিক শ্রম বা রেস্টুরেন্টের কর্মীর মতো কাজগুলোতে প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ অনেক বেশি, তাই আগামী ১০-২৫ বছর সেগুলো নিরাপদ। রান্না করার জন্য হিউম্যান শেফ ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

তবে ব্যাংক, হিসাবরক্ষণ, ভিডিও তৈরি বা ক্রিয়েটিভ এজেন্সির কাজের বড় অংশ এআই দিয়ে সহজে ও কম খরচে করানো যাচ্ছে। আইটি খাতে জুনিয়র লেভেলের প্রোগ্রামিং ও টেস্টিং এআই ভালো করতে পারছে। ফলে নতুনদের জন্য এন্ট্রি লেভেলের চাকরি কমে যাবে।

কর ব্যবস্থার প্রধান সমস্যা কী? করের চড়া হার, নাকি বারবার নীতি পরিবর্তন?

আমাদের অর্থনীতির বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল খাত। বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অনেক বেশি, কারণ অধিকাংশ ব্যবসায় লাভই ১০-১৫ শতাংশের বেশি না। ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ভয়ে কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে চান না। ভারতে যেমন করের হার একক সংখ্যায় (৫ থেকে ৭ শতাংশ) নামিয়ে আনা হয়েছে, বাংলাদেশেও করের হার কমালে ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিবন্ধিত হবেন। নিবন্ধিত হলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং নথিপত্র পাবেন এবং ব্যাংক থেকেও ঋণ নিতে পারবেন। তাই ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য করের চড়া হারটিই বড় বাধা। কর জাল বাড়ানো এবং লাখ লাখ অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক খাতে আনতে হবে।

দেশে বড় কোম্পানি তৈরি না হওয়ার কারণ কী, মূলধন, নীতি নাকি সক্ষমতার অভাব?

আমাদের পুঁজিবাজার এখনো এত অপরিপক্ব যে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য সেখান থেকে মূলধন তোলা কঠিন। ফলে উদ্যোক্তাদের নির্ভর করতে হয় নিজের, আত্মীয়-স্বজনের বা ব্যাংকের অর্থের ওপর। কিন্তু ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। দেশে ৪০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আবার ব্যাংক ঋণ দিতে গিয়ে জামানত ও তাৎক্ষণিক মুনাফা দেখতে চায়। রাজস্ব বা ক্যাশ ফ্লো-ভিত্তিক অর্থায়নের ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি।

ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৫-৬ শতাংশ হলেও ব্যাংকগুলো জামানত ছাড়া তাদের ঋণ দিতে চায় না। বরং বড় করপোরেট বা সরকারি ট্রেজারি বিলে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। যারা আগে বিপুল ঋণ নিয়েছে, তাদেরই আবার নতুন ঋণ বা পুনঃতফসিলের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। অথচ যেসব উদ্যোক্তার নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা আছে, তাদের বেশি সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। এ জায়গায় আমরা সঠিক পথে নেই।

আপনি ভয়েস ফর রিফর্ম শীর্ষক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আছেন। দেশের জন্য কোন সংস্কারটি সবচেয়ে জরুরি?

আমার মতে, সবচেয়ে বড় সংস্কার দরকার আমলাতন্ত্রে। যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় আমলারা তাদের ক্ষমতা ছাড়তে চায় না এবং নানা যুক্তি দিয়ে সংস্কার আটকে দেয়। আমলাতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণ, সুশীল সমাজ ও আমলাদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন। যেন আমলারা সেবকের ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হয়। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সে চেষ্টাও করে যাচ্ছে, যদিও অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

দেশে কি ভালো উদ্যোক্তার অভাব নাকি ভালো পরিবেশ তৈরিতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা রয়েছে?

দেশে উদ্যোক্তার অভাব নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মানসিকতাই প্রমাণ করে আমাদের তরুণদের ঝুঁকি নেয়ার ক্ষমতা কত বেশি। উদ্যোক্তা তারাই যে সম্ভাবনাকে দেখতে পারে এবং ঝুঁকি নিতে পারে। দেশের প্রান্তিক এলাকায় ৮০-৯০ লাখ মানুষ নিজ উদ্যোগে ছোট ব্যবসা পরিচালনা করছে। সমস্যা হলো রাষ্ট্রীয় নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতা নির্দিষ্ট কিছু অলিগার্কদের অনুকূলে। ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের সুবিধা মাত্র পাঁচ হাজার বড় উদ্যোক্তা পেয়েছেন। এ সুযোগ যদি দেশের লাখ লাখ ছোট উদ্যোক্তা পেতেন, তবে অর্থনীতির চেহারা বদলে যেত।

আরও