ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে মোট ১০টি প্যানেল। এর বাইরে কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও বিভিন্ন পদে লড়ছেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এতগুলো প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে ভোট সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রার্থী প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তুলেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা ও আল সাদী ভূঁইয়ার নেতৃত্বে গতকাল ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ নামে প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলন ডেকে এ প্যানেল ঘোষণা করা হয়। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে লড়বেন উমামা ফাতেমা। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি আল সাদী ভূঁইয়া ও সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন জাহেদ আহমদ।
ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ডাকসুতে পদ আছে ২৮টি। এসব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ৫০৯টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাইয়ে ৪৭টি মনোনয়নপত্র প্রাথমিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। গতকাল প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এ তালিকায় বৈধ প্রার্থী ৪৬২ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিপি পদে, ৪৮ জন। জিএস পদে ১৯ জন ও এজিএস পদে ২৮ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন হল আছে ১৮টি। প্রতিটি হল সংসদে ভিপি, জিএসসহ আছে ১৩টি পদ। সব হল মিলিয়ে মোট পদ রয়েছে ২৩৪টি। এর বিপরীতে ১ হাজার ১০৮ জন শিক্ষার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। শুধু ফজলুল হক মুসলিম হলে একজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।
এদিকে প্যানেলভুক্ত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচন নিয়ে উচ্ছ্বসিত ভোটাররাও। এবার সবার আগে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ নামে নিজেদের প্যানেল ঘোষণা করে ইসলামী ছাত্রশিবির। এরপর একে একে ছাত্রদল ছাড়াও বামপন্থী শিক্ষার্থীদের ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’, ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকারের স্বতন্ত্র প্যানেল ‘ডিইউ ফার্স্ট’ এবং তিনটি বাম জোটের ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেল ঘোষণা করা হয়। সব মিলিয়ে ১০টির মতো প্যানেলের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী স্বতন্ত্রভাবেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
এবারের ডাকসু নির্বাচনের প্যানেলগুলোয় এসেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। শীর্ষ তিন পদ ভিপি, জিএস ও এজিএস হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচ নারী শিক্ষার্থী। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সম্মুখসারির নেত্রী উমামা ফাতেমা ডাকসুতে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে ভিপি পদে লড়বেন।
ছাত্রদলের প্যানেলে ঢাবি সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবিদুল ইসলাম খানকে ভিপি, কবি জসীম উদ্দীন হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শেখ তানভীর বারী হামিমকে জিএস ও বিজয় একাত্তর হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক তানভীর আল হাদী মায়েদকে এজিএস প্রার্থী করা হয়েছে।
ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলে ভিপি পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবু সাদিক কায়েম, জিএস পদে ঢাবি শিবির সভাপতি এসএম ফরহাদ ও এজিএস পদে ঢাবি শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খান মনোনয়ন পেয়েছেন।
‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেলে লড়বেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের একাংশের নেতারা। এ প্যানেলে শেখ তাসনিম আফরোজকে (ইমি) ভিপি, ঢাবি ছাত্র ইউনিয়ন একাংশের সভাপতি মেঘমল্লার বসু জিএস ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক দুই সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ও আবু বাকের মজুমদার ভিপি ও জিএস পদে লড়বেন। এ প্যানেলের এজিএস পদে আশরেফা খাতুনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’-এর ২৫ সদস্যের প্যানেলে ভিপি পদপ্রার্থী হয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দীন মুহাম্মাদ খালিদ এবং জিএস পদপ্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বহিষ্কৃত যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন সরকার। এছাড়া এজিএস পদপ্রার্থী হয়েছেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেহা শারমিন এ্যানি। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্যানেলে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত ভিপি পদে ও কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক খায়রুল আহসান মারজান জিএস পদে লড়বেন।
ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেলে ভিপি পদপ্রার্থী হয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা ও জিএস পদপ্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন। এ প্যানেলে এজিএস পদে লড়বেন ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাবি শাখার সদস্য সচিব রাকিবুল ইসলাম। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ), সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএল সমর্থিত ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেলে ভিপি পদে নাঈম হাসান হৃদয়, জিএস পদে এনামুল হাসান অনয় এবং এজিএস পদে ঘোষণা করা হয়েছে অদিতি ইসলামের নাম।
জুবায়ের-মোসাদ্দেকদের আংশিক প্যানেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক এবি জুবায়ের সমাজসেবা সম্পাদক ও জুলাই ঐক্যের সংগঠক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন। ১৩ সদস্যবিশিষ্ট প্যানেলে ভিপি, জিএস, এজিএস না থাকলেও আরো চমক আসতে পারে বলে জানা গেছে।
ডাকসুতে স্বতন্ত্রভাবে ভিপি পদে লড়বেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা জুলিয়াস সিজার তালুকদার, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল ওয়াহেদ, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম হোসেন এবং টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থী জালাল আহমেদ। এছাড়া জিএস পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চ নামে একটি প্লাটফর্মের অন্যতম স্বেচ্ছাসেবক আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত চৌধুরী লড়বেন স্বতন্ত্রভাবে। এদিকে, এজিএস পদে নির্বাচন করবেন মহিউদ্দিন রনি ও ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আরমানুল হক।
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন ২০২৫-এর চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোনো প্রার্থী বা পক্ষ আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বপ্রণোদিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কোনো ধরনের সেবামূলক কাজে অংশ নিতে পারবেন না। সেই সঙ্গে কোনো ধরনের উপঢৌকন বিলি-বণ্টন করতে পারবেন না। এমনকি আপ্যায়ন করানো, অর্থ সহযোগিতা করা কিংবা অনুরূপ কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন না। এ ধরনের কার্যক্রম সুস্পষ্টভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।