এনবিআরের ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলের কাজ পুরোদমে শুরু হয়নি এক দশকেও

কোনো বহুজাতিক কোম্পানির অ্যাসেসমেন্ট হয়নি উদ্ঘাটন করা যায়নি মূল্য লুকোচুরির তথ্যও

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে ২০১২-১৩ অর্থবছরে আয়কর অধ্যাদেশে বেশ কয়েকটি ধারা সংযোজন করে সরকার। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল গঠনের আদেশ দেয়া হয়।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে ২০১২-১৩ অর্থবছরে আয়কর অধ্যাদেশে বেশ কয়েকটি ধারা সংযোজন করে সরকার। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল গঠনের আদেশ দেয়া হয়। এ আদেশের পরের মাসে সেল গঠনের কথা জানায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু ওই সেল এখনো পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারেনি। এমনকি কোনো মূল্য লুকোচুরির তথ্যও উদ্ঘাটন করতে পারেনি তারা।

আয়কর আইনে বলা হয়েছে, কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক লেনদেন যদি বছরে ৩ কোটি টাকার বেশি হয়, তবে সে প্রতিষ্ঠানকে নজরদারি করবে এনবিআরের ‘ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল’। ৩ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হলে ওই প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও কাগজপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। এমনকি বিদেশের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের (সিস্টার কনসার্ন) ব্যবসার ধরনসহ যাবতীয় তথ্যও সংরক্ষণ করতে হবে। ওই প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত দাম দিয়েই পণ্য আমদানি করেছে কিনা তা বছর শেষে যাচাই-বাছাই করবে এনবিআর। প্রতিষ্ঠানটি যে পণ্য আমদানি করেছে সেই পণ্যের ‘আর্মস লেন্থ প্রাইস’ বা বাজারমূল্য নির্ধারণ করবেন কর কর্মকর্তারা। সেটাকে ধরেই পণ্যের শুল্কায়ন করা হবে। আন্তর্জাতিক লেনদেন রয়েছে এ রকম প্রত্যেক ব্যক্তিকে রিটার্নের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্পর্কিত বিবরণীও দাখিল করতে হবে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ইউনিলিভার, দারাজ, হাইডেলবার্গ, ম্যারিকো, প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলসহ নয়টি প্রতিষ্ঠান রিটার্নের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্পর্কিত বিবরণী দাখিল করেছে। এনবিআর তাদের আন্তর্জাতিক লেনদেন পরীক্ষা করছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, প্রথমবারের মতো বহুজাতিক তিনটি কোম্পানির আন্তর্জাতিক লেনদেন পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কর কর্মকর্তাদের আবেদনের পর ওইসব কোম্পানিকে নোটিস পাঠাতে অনুমোদনও দেয়া হয়েছে। যেকোনো দিন নোটিস পাঠানো হবে। তবে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করতে চায় না এনবিআর।

এনবিআরের একজন সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ট্রান্সফার প্রাইসিং খুব টেকনিক্যাল ব্যাপার। এটা এতদিন সক্রিয় ছিল না। প্রথমবারের মতো অ্যাসেসমেন্ট হচ্ছে। এর আগে হয়নি। শিগগিরই তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হবে।’

ওই সদস্য বলেন, ‘প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহায়তায় প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। কারণ এটা একা করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক তথ্য পর্যালোচনা করতে হয়। সেজন্য ডাটাবেজ প্রয়োজন। ডাটাবেজ ব্যবহারের খরচও অনেক। ইইউর অর্থায়নে এক বছরের জন্য আমরা বেঞ্চ মার্কিং টুল ডাটাবেজ ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছি। চলতি অক্টোবর থেকে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর মেয়াদ। তারপর পুনরায় মেয়াদ নবায়ন করতে হবে।’

ট্রান্সফার প্রাইসিং কীভাবে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা বহুজাতিক কোম্পানির “‍সহযোগী” কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হয়। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো কাঁচামাল মূল্য বেশি দেখিয়ে আমদানি করে সেই অতিরিক্ত মূল্য পুনরায় ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।’

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো একটি কোম্পানি বিদেশ থেকে অন্য একটি কোম্পানির কাছ থেকে ৩০০ টাকা দরে পণ্য আমদানি করল। সেই পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে একই ধরনের পণ্য অন্য প্রতিষ্ঠান কত টাকা দর দিয়ে আমদানি করে কিংবা একই ধরনের পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কত, সেটাই আর্মস লেন্থ প্রাইস বা বাজারমূল্য। ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠান আর্মস লেন্থ প্রাইসের চেয়ে ১০০ টাকা বেশি দামে পণ্য আমদানি করল। সেটা ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল কর্মকর্তারা ধরে ফেললেন। তাহলে ওই ১০০ টাকার ওপর বাড়তি করারোপ করবেন কর কর্মকর্তারা। জরিমানাও হতে পারে।’

এনবিআরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এতদিন ছিল এনবিআরের প্রস্তুতিমূলক পর্ব। এ সময়ে এনবিআর কর্মকর্তারা কীভাবে কাজ করবেন, এর কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেছে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও মরক্কোয় প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। গত দুই বছরে দেশে নয় কর্মকর্তাকে ইইউর সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে পোল্যান্ডে পাঁচজনকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে।’

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে সাতজন কর কর্মকর্তাকে এ সেলে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন সেলপ্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয় বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) যুগ্ম কমিশনার একেএম আতিকুল হককে। এভাবে বিভিন্ন সময় কর্মকর্তাদের সংযুক্ত করা হয় এ সেলে। কিন্তু সেলটিতে ডেডিকেটেড কোনো কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। সেলটি তদারক করেন এনবিআরের সদস্য (আন্তর্জাতিক কর)। এ পদেও বারবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে স্থিতিশীলতা আসেনি।

এনবিআর সূত্র দাবি করেছে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কর ফাঁকি দিয়ে নিজেদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ অন্য দেশে অবস্থিত সহযোগী প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। এতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ে, কিন্তু কর কম দিতে হয়। এটা একধরনের অর্থ পাচার। বাংলাদেশে কাজ করছে এমন অনেক বহুজাতিক কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে একই প্রক্রিয়ায় কর ফাঁকি দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি যোগ দেয়ার পর ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলকে সচল করা হয়েছে। পুরোদমে কাজও শুরু হয়েছে। শিগগিরই তিনটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক লেনদেন যাচাই করা হবে।’

আরও