এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান, অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান কিংবা প্রতিবেশী ভারতের তুলনায়ও দেশে তরুণদের মধ্যে এসব বিষয়ে উদ্বেগের হার বেশি। যদিও এ সময়েই জনমিতিক লভ্যাংশের (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে বাংলাদেশ। তরুণদের সংখ্যাধিক্যের এ সুফল ২০৪০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করেন গবেষকরা।
সম্প্রতি ‘লাইভস, চয়েজেস অ্যান্ড ফিউচারস: ডেমোগ্রাফিক ফিউচারস সার্ভে’ শীর্ষক বৈশ্বিক জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)। জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ। বিশ্বের ৭৩টি দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, একই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভুটানের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ, আফগানিস্তানের ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ, ভারতের ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শ্রীলংকার ৪৫ শতাংশ তরুণ। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ নেপাল ও মালদ্বীপ এ জরিপের আওতায় ছিল না।
কেবল দক্ষিণ এশিয়াই নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ৭৩টি দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও বৈষম্য নিয়ে তরুণদের উদ্বেগের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। তালিকার শীর্ষে রয়েছে কোস্টারিকা, যেখানে ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ তরুণ একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের ওপরে এশিয়ার একমাত্র দেশ ফিলিপাইন; দেশটির ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ তরুণ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। এমন বাস্তবতায় আজ বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস পালিত হচ্ছে।
জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী, দেশের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের যুব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ২০২২ সালের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। বিরাট এ তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তি। তবে আধুনিক শিক্ষা, যুগোপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে এ সম্ভাবনাই ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা না গেলে জনমিতিক লভ্যাংশই একসময় জনমিতিক চাপ বা বোঝায় পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ জনমিতিক সুবিধার যুগে প্রবেশ করলেও দূরদর্শিতার অভাবে যুব জনগোষ্ঠীকে ঘিরে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়নি বলে মনে করেন বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম মাশরুর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার মতো দক্ষতা বা সক্ষমতা আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের নেই। তরুণদের দক্ষ করে তোলার জন্য আমরা কোনো পূর্বপরিকল্পনা নিতে পারিনি। রাজনীতিবিদরা দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা না করলেও আমলাদের সেটি করার কথা ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যেও দূরদর্শী পরিকল্পনা করার মানসিকতা গড়ে ওঠেনি। জনমিতিক সুবিধার পর্যায়ে প্রবেশের পর গত ১০-১৫ বছর ধরে দেশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হয়তো হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এসব উদ্যোগের কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বা সুফল দেখা যায়নি। কারণ আমাদের দেশে এখনো আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।’
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ছয় বছরে দেশে শুধু স্নাতক ডিগ্রিধারীই তৈরি হয়েছে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৩২৯ জন। এছাড়া পাস কোর্স ডিগ্রি নিয়েছেন ৯ লাখ ৯৮ হাজার ৯৬৮ জন এবং কারিগরিসহ বিশেষায়িত ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়েছেন আরো ৭৩ হাজার ৪২ জন।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট গত মার্চে এক বিবৃতিতে বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম তরুণ চাকরি পাননি। তরুণীরা এক্ষেত্রে আরো বড় বাধার মুখে পড়েছেন।
জোহানেস জাট আরো বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছেন, যেখানে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ৮৭ লাখ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করে দুই বছর ধরে চাকরির চেষ্টা করছেন আরিফুল ইসলাম। সরকারি চাকরির পেছনে তিন বছর ঘুরে এখন বেসরকারি চাকরির পেছনে ছুটছেন তিনি। তবে সেখানেও কোনো কূলকিনারা পাননি। বণিক বার্তাকে এ তরুণ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যা পড়েছি, চাকরির বাজারে গিয়ে সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা খুব কমই দেখতে পাচ্ছি। এখানে প্র্যাকটিক্যাল স্কিলের চাহিদা বেশি। এখন মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ৫-৬ বছর সময় শুধু নষ্টই করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষা এখন কোনো কাজেই আসছে না।’
দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘গত ৫৫ বছরে মানবসম্পদ উন্নয়নে রাষ্ট্র বিপুল বিনিয়োগ করলেও সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। কারণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব, নীতিগত ও বাজেটগত ওভারল্যাপ এবং দায়িত্ব পালনে অসংগতি ছিল। যদি প্রত্যেকে নিজের নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করত এবং সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ, তদারকি ও সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করত তাহলে বাজেটের অপচয়, নীতির পুনরাবৃত্তি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা অনেকাংশ কমে আসত।’
ইউএনএফপিএর জরিপে বৈশ্বিকভাবে অংশগ্রহণ করেছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯২৬ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তরুণ-তরুণী। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ তরুণই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রেও আর্থিক সচ্ছলতার বিষয়টি তাদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে। ৮১ শতাংশ তরুণ বিয়ের আগে এবং ৮৮ শতাংশ তরুণ সন্তান নেয়ার আগে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অপরিহার্য মনে করেন। এছাড়া একটি স্থায়ী চাকরিকে প্রয়োজনীয় মনে করছেন ৮৭ শতাংশ তরুণ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছে না দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ। একই সঙ্গে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও উদ্বেগজনক। দেশে মোট বেকারের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ স্নাতক এবং ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক পাস। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বেকারের একজনই স্নাতক বা উচ্চ মাধ্যমিক সনদধারী। অন্যদিকে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুব বেকারদের প্রায় ২৯ শতাংশই স্নাতক। অর্থাৎ প্রতি তিনজন স্নাতক তরুণের একজন বেকার।
দেশের তরুণদের দক্ষ করে তুলতে সরকারের একাধিক কর্মসূচি চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে বর্তমানে ৮৩টি ট্রেডে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক—উভয় ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। দেশের ৭৩টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ইলেকট্রনিক, ইলেকট্রিক্যাল, হাউজকিপিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।’
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘আর্ন’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় আগামী ৩০ মাসে সাত লাখ মানুষকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। সার্ভিস প্রোভাইডারদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ প্রকল্পের চুক্তি আগামীকাল স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সরকার আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো এ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।