তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের সংষর্ষে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা রণক্ষেত্র

রাজধানীতে তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল কয়েক দফা হামলা-পাল্টাহামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয় যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকা।

রাজধানীতে তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল কয়েক দফা হামলা-পাল্টাহামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয় যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকা। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয় সেনা ও বিজিবি।

সংঘর্ষের একপক্ষে ছিলেন যাত্রাবাড়ীর ডেমরা রোডে অবস্থিত ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা। অন্যপক্ষে ছিলেন ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা।

ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, ১৬ নভেম্বর ডেমরার ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থী অভিজিৎ হালদার ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি হন। ১৮ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়। ওইদিন রাতে তার পরিবার ও কলেজের কিছু শিক্ষার্থী ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগে হাসপাতালে ভাংচুর চালান। ২০ নভেম্বর পুনরায় ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের ৫০০-৬০০ শিক্ষার্থী হাসপাতালে এসে ভাংচুর চালান। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাসপাতালের পরিচালক চার চিকিৎসক ও দুই শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু ওই সময় হাসপাতাল চত্বরে অবস্থানরত ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। সন্ধ্যার পর স্থানীয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে একাত্মতা জানাতে আসেন। এ সময় ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা তা না মানায় উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

গতকালের সংঘর্ষের ব্যাপারে পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা জানান, গত রোববার ‘সুপার সানডে’ কর্মসূচি দেন মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এদিন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ও পাশের সোহরাওয়ার্দী কলেজে ব্যাপক ভাংচুর চালান মোল্লা কলেজসহ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। ওই হামলার প্রতিবাদে গতকাল ‘মেগা মানডে’ কর্মসূচির ডাক দেন সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর অংশ হিসেবে সকাল থেকে সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেন। পরে তারা মিছিল নিয়ে কবি নজরুল কলেজের সামনে যান। সেখান থেকে দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ডেমরা সড়কসংলগ্ন মোল্লা কলেজে হামলা চালান। এ সময় মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। এতে আহত হন শতাধিক। এর মধ্যে অন্তত ১৫ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানান, আহতদের সবাই আশঙ্কামুক্ত। আহতদের মধ্যে রয়েছেন সোহরাওয়ার্দী কলেজের রাজীব (১৯) ও শাহেদুল ইসলাম (২০)। কবি নজরুল সরকারি কলেজের অনুপম দাস (২৩), রানা (২০), সুমন (২২), মারুফ হোসেন (১৯), হাসিনুর রহমান (১৯), আরাফাত হোসেন (১৯), সলিমুল্লাহ কলেজের মোহাম্মদ রুমান (১৯) ও ইম্পেরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী হুমায়ুন কবির (২০)।

সংঘর্ষের বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ছালেহউদ্দিন বলেন, ‘২০-২৫ হাজার শিক্ষার্থী যাত্রাবাড়ী মোড় হয়ে মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলার জন্য আসে। তারা আমাদের ওভারটেক করে চলে আসে। আমরা তাদের পেছনে পেছনে এসে বারণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা এসে ভাংচুর করেছে, চড়াও হয়েছে। তাদের সঙ্গে এলাকার জনগণও ছিল।’

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের জেরে অনেক শিক্ষার্থী আহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখিত ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন মর্মে অনেকেই অপপ্রচার চালাচ্ছেন, যা মোটেই সঠিক নয়।’

তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের জের ধরে হামলা হয় পুরান ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুল অ্যান্ড কলেজেও। সূত্রাপুর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু কারা হামলা চালিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

অবশ্য সেখানকার শিক্ষার্থীরা হামলার জন্য সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের দায়ী করেছেন।

এদিকে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনার পরই কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কবি নজরুল সরকারি কলেজের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অনিবার্য কারণবশত আগামীকাল (আজ) কবি নজরুল সরকারি কলেজের শ্রেণী পাঠদান বন্ধ থাকবে।’

এর আগে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘অনিবার্য কারণবশত ২৫ ও ২৬ নভেম্বর কলেজের সব শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’

ডিএমপি সূত্র বলছে, ৩৫টি বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে ইউনাইটেড কলেজ অব বাংলাদেশ (ইউসিবি) নামে একটি ফোরাম রয়েছে। অন্যপক্ষে রাজধানীর ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ ও সরকারি কবি নজরুল কলেজ মিলে সাত কলেজের ছাত্রছাত্রীদের একটি জোট রয়েছে। অভিজিতের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এ দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা চলছে।

ভাংচুর ও গুলিভর্তি ম্যাগজিন চুরির অভিযোগে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজসহ তিন কলেজের প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রাজধানীর সূত্রাপুর থানায় মামলা করেছে পুলিশ। রোববার সংশ্লিষ্ট থানায় করা এ মামলার এজাহার গতকাল আদালতে আসে। ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াদুর রহমানের আদালত তা গ্রহণ করেন। সূত্রাপুর থানার এসআই একেএম হাসান মাহমুদুল কবীর মামলাটি করেন।

আরও