চলতি আমন মৌসুমে সরকারিভাবে ৩ লাখ
টন ধান ও ৫ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেয় সরকার। গত ১০ নভেম্বর শুরু হয়
ধান-চাল সংগ্রহ। এরই মধ্যে কাটা হয়েছে ৮৫ শতাংশ আমন। তবে সংগ্রহের ৩৬ দিন পেরিয়ে গেলেও
ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩৩ টন। এক দফা সময় বাড়িয়েও চালের জন্য মিলারদের সঙ্গে চুক্তি
হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৪ টনের। যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭৩ শতাংশ। বাকি ২৭ শতাংশ
চাল কেনার জন্য মিলারদের সঙ্গে চুক্তিই হয়নি।
খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে বাজারে ধানের দাম বেশি হওয়া ও সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতে প্রক্রিয়াগত জটিলতায় কৃষক স্থানীয় বাজারেই ধান বিক্রি করছেন। আবার মিলাররাও দাম কম পাওয়ায় চাল দিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ততটা আগ্রহী নন। ফলে পূর্বনির্ধারিত ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বরাবরের মতো অধরাই থেকে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধান সংগ্রহ হয়েছে ৩৩ টন। আর চাল সংগ্রহ হয়েছে ৩৪ হাজার ২১ টন। কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলেও সাধারণত চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য মিলগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। শুরুতে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সময়সীমা বাড়ানো হয়। নির্ধারিত এ সময়সীমা শেষে চুক্তি হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৪ টনের। চুক্তিবদ্ধ হয়েছে ৬ হাজার ৮৯৫টি মিল। বাকি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৭৬ টন চাল কেনার জন্য চুক্তি করতে পারেনি খাদ্য মন্ত্রণালয়।
আমন মৌসুমের ৮৫ শতাংশ জমির ধান কর্তন করা হয়েছে। ৫৯ লাখ ৬ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে কাটা হয়েছে ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ফসল। এসব জমিতে ফলন হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টন। এ বছর ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়। উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছিল ১ কোটি ৬৩ লাখ টনের।
স্থানীয়ভাবে কৃষকরা ধান কাটলেও সরকারি দামের চেয়ে বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় তা খোলাবাজারে বিক্রি করছেন। নওগাঁর মান্দা উপজেলার সতিহাট বাজারে গতকাল শুক্রবার মানভেদে প্রতি মণ স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ১ হাজার ২৩০ টাকা থেকে ১ হাজার ২৪০ টাকা, গুটি স্বর্ণা ১ হাজার ১৩০ টাকা থেকে ১ হাজার ১৪০ টাকা ও ব্রিধান-৫১ ১ হাজার ১৮০ টাকা থেকে ১ হাজার ১৯০ টাকা মণ দরে কেনাবেচা হয়েছে। সদর উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের চুনিয়াগাড়ী গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘দেড় বিঘা জমিতে স্বর্ণা-৫ জাতের ধানের আবাদ করে পোকার আক্রমণে ফলন কিছুটা কম হয়। ২০ মণ ধান পেয়েছি। যা স্থানীয় ত্রি-মোহনী হাটে ১ হাজার ২৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছি। সরকারি গুদামে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ১২০ টাকা। এছাড়া এই পরিমাণ ধান দিলে মিটার পাস করার কারণে প্রতি মণ ধানে আরো তিন কেজি করে ওজন কমে যেত। তাই ওই দামে গুদামে চাল দেয়া সম্ভব না।’
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কৃষক সোহেল রানা বণিক বার্তাকে বলেন, আমন ধান কেটে মাঠে থাকতেই বিক্রি করে দিয়েছি। গুটি স্বর্ণা ও ব্রি-৫১ শুরুতে ১ হাজার ২৫০ টাকা বিক্রি করেছি। সরকারিভাবে বিক্রি করতে গেলে পরিবহন খরচ ও শ্রমিক খরচ দিয়েও মাত্র ১ হাজার ২২০ টাকা পেতাম। এ কারণে কেউই সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে চাইছে না এবার।
প্রতি বছর সাধারণত চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না। চলতি বছর বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধান ২৭ টাকায়, সিদ্ধ চাল ৪০ টাকায় ও আতপ চাল ৩৯ টাকায় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এ সময় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজার টন। নির্ধারিত সময় শেষে বোরো ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭৪ টন। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার ৫৯ ভাগই পূরণ হয়নি। এছাড়া চালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ লাখ টন। তার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ১১ লাখ ২০ হাজার ৮৮ টন। আর আতপ চালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হাজার টন। তার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ৫৪ হাজার ৮৯২ টন।
এদিকে আমন মৌসুমের নির্ধারিত সময় এক দফা বাড়ানোর পরও লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি মিলারদের সঙ্গে চাল সংগ্রহের চুক্তি। মিল মালিকরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাল বিক্রি করতে গেলে লোকসান গুনতে হবে। ফলে অনেকেই চুক্তি করেননি। আবার যারা চুক্তি করেছেন তারাও সন্তুষ্ট নন। নওগাঁ সদর উপজেলার হাফিজ অটোমেটিক রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমান বলেন, দুই বছর ধরে অটোমেটিক রাইস মিল ব্যবসায় যুক্ত আছি। ধানের বাজারের সঙ্গে চালের বাজারের সামঞ্জস্য না থাকায় লাভের পরিবর্তে ব্যাপক লোকসান গুনতে হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি গুদামে প্রতি কেজি চাল ৪-৫ টাকা লোকসানে সরবরাহ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এবার আমার মিলে কত টন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তা খোঁজ নিতেও যাইনি। মিলের সব কার্যক্রম বন্ধ রেখেছি।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করতে জেলার ৮৬ শতাংশ মিল চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। যাদের ন্যূনতম সামর্থ্য নেই তাদের পক্ষে চুক্তিবদ্ধ হওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বাজারদর অনুযায়ী ধান কিনে সরকারি গুদামে চাল দিতে হলে প্রতি কেজিতে কমপক্ষে ৪-৫ টাকা লোকসান গুনতে হবে মিলারদের। এতে মিল ব্যবসার ইতিহাসে সর্বোচ্চ লোকসান হবে। সরকারের আপত্কালীন মজুদ বৃদ্ধিতে মিলারদের দায়িত্ব রয়েছে। তাই লোকসান হলেও মিলাররা চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। যেহেতু মিলাররা সরকারের পাশে দাঁড়াতে ক্রান্তিকালেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন, সেই দিকটি বিবেচনা করে প্রতি কেজি চাল সরবরাহে ৫ টাকা প্রণোদনার দাবি জানানো হয়েছে। আমরা আশা করছি সরকার এই যৌক্তিক দাবি মেনে নেবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নওগাঁ খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাজারে ধানের যে মূল্য সে অনুযায়ী এক কেজি ধানও সরকারি গুদামে কোনো কৃষক দেবেন না। এর পরও চাকরি রক্ষার্থে সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন হলে সেখানে পকেটের টাকায় কিছুটা ভর্তুকি দিয়ে ধান কিনে কৃষকের নামে সংগ্রহ দেখানো হয়। স্থানীয় বাজারের সঙ্গে ধানের সরকারি ক্রয়মূল্যের ব্যবধান কমে গেলে কৃষকের ধান পাওয়া যাবে।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার
ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি মূল্যের চেয়ে যদি বাজারদর বেশি হয় তাহলে কেন
কৃষক সরকারের কাছে বিক্রি করবেন? এরপর সরকারিভাবে ধান বিক্রি করতে গেলে খাদ্য গুদামে
পৌঁছে দিতে হয়। অন্যদিকে পাইকাররা ঘর থেকে এসে ধান নিয়ে যান। এখানে শ্রমিক খরচ লাগছে
না, পরিবহন খরচও লাগছে না। কৃষকরা যদি সরকারি দামের চেয়ে কম দাম পান তাহলেও তো বিক্রি
করবেন। আরো ঝামেলা তো আছেই। প্রতি বছর সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম লক্ষ্যমাত্রা
ছুঁতে পারে না। কেন পারছে না এটা নিয়ে বিশ্লেষণ করলেই তো হয়।’
খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. রায়হানুল কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাল সংগ্রহে প্রতি বছরই আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। তবে ধানের ক্ষেত্রে ক্রয়ের চেয়ে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য থাকে। এবার বাজারও কৃষক সহায়ক। সরকার মাঠে না থাকলে এ দাম কৃষক পেতেন না। মিলারদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তারা চুক্তি পূরণ করতে পারলে এরপর আবার বরাদ্দ দেয়ার নিয়ম আছে। তখন পুনরায় বরাদ্দ দিলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাবে। মিল-মালিকরা প্রতি বছরই বলেন লোকসান হচ্ছে। এটা তাদের ব্যবসায়িক বক্তব্য। তারা বলতেই পারেন। তবে আমাদের চাল সংগ্রহ কার্যক্রম প্রতি বছরই সফল হচ্ছে। এবারো চালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।’
ধানের দামের বিষয়ে ভবিষ্যতে পর্যালোচনা
করা হবে জানিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইসমাইল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চুক্তিবদ্ধ মিলগুলো তাদের বরাদ্দ
সমপরিমাণ জমা দেয়ার পর পুনরায় বরাদ্দ নিতে চাইলে তাদের দেয়া হয়। এতে চালের যে লক্ষ্যমাত্রা
তা আশা করছি পূরণ হয়ে যাবে। তবে ধানের ক্ষেত্রে আমরা যখন দাম নির্ধারণ করে দিই এরপর
বাজারে দাম বেড়ে গেছে। ফলে কৃষকরা বাজারে বিক্রি করতেই বেশি আগ্রহী। পরবর্তী সময়ে বিশেষ
করে ধানের দামের ক্ষেত্রে আমরা পর্যালোচনা করব।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে
সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার নওগাঁ প্রতিনিধি আরমান হোসেন রুমন)