বাগেরহাটের মা-মেরী ব্যাগ ফ্যাক্টরি

অর্থাভাবে বন্ধ উৎপাদন, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্টের শঙ্কা

অর্থাভাবে এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে বাগেরহাটের নারী উদ্যোক্তা মেরী বেগমের টিস্যু ব্যাগ ফ্যাক্টরি। কাজ না থাকায় বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ফ্যাক্টরির ২২ শ্রমিক। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় নষ্ট হতে চলেছে ফ্যাক্টরির মেশিন, কেমিক্যাল, কাঁচামালসহ কোটি টাকার সরঞ্জাম।

অর্থাভাবে এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে বাগেরহাটের নারী উদ্যোক্তা মেরী বেগমের টিস্যু ব্যাগ ফ্যাক্টরি। কাজ না থাকায় বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ফ্যাক্টরির ২২ শ্রমিক। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় নষ্ট হতে চলেছে ফ্যাক্টরির মেশিন, কেমিক্যাল, কাঁচামালসহ কোটি টাকার সরঞ্জাম। এর সঙ্গে রয়েছে দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রদানের চাপ। মা-ছেলের ঘাম ঝরানো অর্থে গড়া ফ্যাক্টরিই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাগেরহাট সদর উপজেলার বৈটপুর গ্রামের মেরী বেগমের। ২০ লাখ টাকা মূলধন হলে আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে জানিয়েছেন নারী উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, বিয়ের পর অভাবের তাড়নায় স্বামীসহ চট্টগ্রামে চলে যাই। গার্মেন্টে কাজ করে স্বামী-সন্তান নিয়ে মোটামুটি কেটে যাচ্ছিল। সব সময় ইচ্ছা ছিল গ্রামে যাব, সেখানে কিছু একটা করব। কিন্তু সন্তানাদিসহ শহরে থাকা-খাওয়ার খরচের পর টাকা জমানো খুবই দুরূহ ব্যাপার। এর পরও সংসারের খরচ সীমিত করে ২৪ বছরে জমানো লাখ পাঁচেক টাকা নিয়ে গ্রামে আসি। ২০০৮ সালের প্রথমদিকে স্বামী ফকির নুরুজ্জামান গার্মেন্টস মেকানিক ছেলে মো. মিলনকে সঙ্গে নিয়ে টিস্যু ব্যাগের ব্যবসা শুরু করি। বৈটপুর বাজারে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে স্বল্প পরিসরের ব্যবসায় মোটামুটি লাভ হতে থাকে। লাভ কর্মচারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে প্রতিষ্ঠানে। মূলধনের সংকট মেটাতে ২০১৭ সালে ইউনাইটেড ফাইন্যান্স লিমিটেড থেকে ১৫ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করি। ভালো ব্যবসা হওয়ায় দুই বছরেই তাদের ঋণ শোধ করে দিই। ২০১৯ সালে ফ্যাক্টরি বড় করার জন্য বৈটপুর বাজার থেকে পার্শ্ববর্তী বটতলা বাজারে জমি লিজ নেই। সেখানে ১০ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে ফ্যাক্টরি ভবন তৈরি করি। বৈটপুর বাজারের ফ্যাক্টরি থেকে পুরনো মেশিনপত্র বিক্রি করে দিই। ইউনাইটেড ফাইন্যান্স লিমিটেড থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণের আশ্বাসে ৪২ লাখ টাকায় মেশিন ক্রয়ের চুক্তি করি। কিন্তু ইউনাইটেড ফাইন্যান্স লিমিটেড মেশিন ক্রয়ের জন্য আমাকে মাত্র ২৫ লাখ টাকা ঋণ দেয়। তিন মাস পর আবারো কাঁচামালের জন্য ২৫ লাখ টাকা দেয়ার অঙ্গীকার করে। মেশিন আনুষঙ্গিক মালামালের জন্য আমার ৬০ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়ে যায়। যার ফলে আমাদের নিজস্ব মূলধনের পাশাপাশি ১৫ লক্ষাধিক টাকা ধার-দেনা করি। এরপর কাঁচামালের জন্য অবশিষ্ট কোনো টাকা না থাকায় ফ্যাক্টরি পুরোদমে চালু করতে পারিনি।

মেরি বেগম আরো বলেন, ফ্যাক্টরি চালু করতে না পারলেও ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে প্রায় ১০ মাস ১০ কিস্তিতে ইউনাইটেড ফাইন্যান্সকে লাখ ৩০ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করেছি। কারণ ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা আমাকে বলেছিলেন, ঋণের কিস্তি দেন ছয় মাস পর আপনাকে কাঁচামালের জন্য আরো ২৫ লাখ টাকা ঋণ দেব। কিন্তু ১০ মাসেও তারা আর ঋণ দেননি। এদিকে মূলধনের অভাবে আমার ফ্যাক্টরি বন্ধ রয়েছে। ফ্যাক্টরির মূল্যবান মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। আমার পরিবারও এক ধরনের মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যদি মাত্র ২০ লাখ টাকা ঋণ পাই, তাহলে আবারো ব্যবসা করে সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে পারব। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

মা-মেরী টিস্যু ব্যাগ ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপক হারুণ শেখ বলেন, ফ্যাক্টরি চালু থাকা অবস্থায় বাগেরহাটসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় আমরা ব্যাগ সরবরাহ করতাম। ২০২০ সালের মার্চ থেকে আমাদের ফ্যাক্টরি বন্ধ। ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও কয়েক মাস ২২ জন শ্রমিককে বেতন দিয়েছি। কারণ হঠাৎ করে বন্ধ হলে তারা কোথায় যাবে। কিন্তু বর্তমানে এমন অবস্থা আমাদের যে মালিকের ঘরেও খাবার নেই। অবস্থায় মালিকসহ আমাদের ২০-২৫টি পরিবারের না খেয়ে মরার অবস্থা হয়েছে। অন্তত শ্রমিক পরিবারগুলোর কথা চিন্তা করে হলেও ফ্যাক্টরিটিকে আবারো চালুর দাবি জানান তিনি।

মেরি বেগমের ছেলে মো. মিলন বলেন, সবকিছু ছেড়ে মায়ের সঙ্গে ব্যাগের ব্যবসা শুরু করি। ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের প্রতারণায় আমার ফ্যাক্টরি আজ বন্ধ। শ্রমিকরা না খেয়ে মরছে। আমার রক্ত পানি করা টাকায় কেনা মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ইউনাইটেড ফাইন্যান্স এর আগে আমাদের দুবার ঋণ দিয়েছে, আমরা তো তাদের টাকা দিয়ে দিয়েছি। এবারো তারা আশ্বাস না দিলে আমরা এত বেশি দামের মেশিন কিনতাম না। তাদের আশ্বাসে মেশিন কিনেছি। মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা এত বেশি যে দুই সপ্তাহ মেশিন চালাতে অন্তত ২০ লক্ষাধিক টাকার কাঁচামাল প্রয়োজন। অবস্থায় অন্তত ২০ লাখ টাকা পেলে আমরা আবারো শুরু করতে পারতাম। আমার শ্রমিকরাও খেয়ে-পরে বাঁচতে পারতেন। বৃদ্ধ মা পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কামনা করেন ব্যবসায়ী।

মো. মিলন আরো বলেন, ফ্যাক্টরি চালুর জন্য স্থানীয় অনেক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। সবাই বলে ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের সঙ্গে আগে লেনদেনের সমাধান করুন, তারপর ঋণ পাবেন। অন্যদিকে ইউনাইটেড ফাইন্যান্সও আমাকে আর টাকা দিচ্ছে না। বরং তাদের পাওনা টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। দু-এক মাসের মধ্যে ফ্যাক্টরি চালু করতে না পারলে মাকে নিয়ে আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিলন।

ঋণের বিষয়ে ইউনাইটেড ফাইন্যান্স লিমিটেডের হেড অব করপোরেট স্ট্র্যাকচারড ফাইন্যান্স এমডি মাহবুবুর রহমান খান বলেন, মেরী বেগমের ঋণের বিষয়টি আমি অবগত রয়েছি। তবে বিষয়ে আমি অফিশিয়ালি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।

আরও