ঢাকার দুটি পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিমানবন্দর-কমলাপুর ‘এমআরটি লাইন ১’-এ ব্যয় হবে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে হেমায়েতপুর-ভাটারা ‘এমআরটি লাইন ৫, নর্দান রুট’-এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। এতে প্রকল্প দুটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪২ কোটি টাকায়। গতকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। একই সভায় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এমআরটি লাইন ৫, সাউদার্ন রুট নামে নতুন আরেকটি মেট্রোরেল প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।
এমআরটি লাইন ১ প্রকল্পটি ২০১৯ সালের অক্টোবরে অনুমোদিত হয়। সে সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। তবে অনুমোদনের সাত বছর পার হতে চললেও এখনো মাঠ পর্যায়ে মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এখন প্রকল্পের মেয়াদ সাত বছর বাড়িয়ে ২০৩৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় এমআরটি লাইন ৫, নর্দান রুটের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এ মেট্রোরেলে হেমায়েতপুর-আমিনবাজার অংশটি উড়ালপথ হবে। আর আমিনবাজার-ভাটারা অংশটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পাতালপথে যাবে। প্রকল্পটি মূলত ২০২৮ সালের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের মেয়াদ এখন ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে গতকাল একনেকে অনুমোদন পেয়েছে এমআরটি লাইন ৫, সাউদার্ন রুট নামে নতুন একটি মেট্রোরেল প্রকল্প। ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। গাবতলী থেকে শুরু হয়ে কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাসেরকান্দিতে শেষ হবে এ মেট্রোরেল।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, এ রুটে স্টেশন থাকবে ১৫টি। এর মধ্যে ১১টি ভূগর্ভস্থ ও চারটি এলিভেটেড। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশ হবে ভূগর্ভস্থ এবং আফতাবনগর থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত হবে এলিভেটেড। এ রুটে প্রাথমিকভাবে ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচবিশিষ্ট ১৯টি মেট্রোরেল পরিচালনা করা হবে। প্রতিটি মেট্রোরেল সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। এটি চালু হলে গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত যাতায়াতে সময় লাগবে ২৮ মিনিট।
এদিকে এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট)-এর ডিপিপি অনুমোদন পাওয়াকে একটি বড় ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এতদিন এককভাবে জাইকার অর্থায়ন ও তাদের নির্দিষ্ট টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনের ওপর নির্ভর করার কারণে পাতাল অংশের প্যাকেজগুলোতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা হতে পারেনি। এখন এডিবি ও কোরিয়ার ইডিসিএফের মতো বিকল্প অর্থায়নের ফলে নতুন করে স্পেসিফিকেশন তৈরির সুযোগ মিলবে। এতে ঢাকায় প্রতি কিলোমিটার পাতালপথ নির্মাণের প্রকৃত ব্যয় কত হওয়া উচিত, তার একটি বস্তুনিষ্ঠ ও তুলনামূলক চিত্র সামনে আসবে এবং নির্মাণ ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিভ্রান্তি কেটে যাবে।’
‘এমআরটি লাইন ১’ ও ‘এমআরটি লাইন ৫, নর্দান রুট’ প্রকল্প দুটির ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। সে সময় বিভিন্ন প্যাকেজের দরপত্রে অংশ নেয়া ঠিকাদারদের সর্বনিম্ন দর ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এরপর প্রক্রিয়া ধীর করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান এবং দর প্রস্তাবকারী ঠিকাদারদের সঙ্গে ‘নেগোসিয়েশন’-এর উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি। যদিও এ প্রক্রিয়ায় সায় দেয়নি প্রকল্প দুটির ঋণদাতা সংস্থা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর মেট্রোরেল প্রকল্পের দর প্রক্রিয়া আবার গতি পায়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল প্রকল্প দুটির সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করা হলো।
সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কভিড মহামারীর সময় নকশা ও দরপত্র প্রস্তুত করতে বিলম্ব এবং দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল বাস্তবায়নে জটিলতাকে দায়ী করা হয়েছে।
অন্যদিকে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প দুটির ব্যয় বৃদ্ধি ও সুদের হার পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। গতকাল একনেক সভা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, কাজের পরিধি বৃদ্ধি, স্টেশনের গভীরতা বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধির কারণে প্রকল্প দুটির ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যয় বৃদ্ধি ও অন্যান্য সংশয় যাচাই করতে সাবেক সচিব, বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী, আইটি ও ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রকৌশলী শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই প্রাক্কলন সংশোধন করা হয়েছে।’
তিনি জানান, প্রকল্প দুটির ঋণ চুক্তিতে সুদের হারও বাড়ছে। অতীতে জাইকার সুদের হার দশমিক ৭ শতাংশ অনুমিত থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগামীতে প্রতি কোয়ার্টারে এ হার আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রকল্প গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা হলে ব্যয় ও ঋণের বোঝা আরো বাড়তে পারে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকার তীব্র যানজট ও জনসংখ্যা বিবেচনায় ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল ব্যবস্থার বিকল্প নেই। এটি চালু হলে জ্বালানি সাশ্রয়, যাতায়াতের সময় হ্রাস এবং নাগরিকদের কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে। সামগ্রিক জনস্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি এড়াতেই সংশোধন সাপেক্ষে প্রকল্প দুটি এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’