দিঘির আধিক্যের জন্য সিলেটকে বলা হতো দিঘির শহর। নগরীর বিভিন্ন এলাকার নামকরণও হয়েছে দিঘির নামে। ধোপাদিঘি, সাগরদিঘি, লালদিঘি, বেকাদিঘি, রামেরদিঘি, কাজীদিঘি, মাছুদিঘিসহ আরো অনেক দিঘি ছিল নগরীতে। অসংখ্য পুকুরও ছিল, তবে অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। যেগুলো রয়েছে তাও একপ্রকার অস্তিত্বহীন। পরিবেশবাদীরা বলছেন, মানবসভ্যতা রক্ষায় এসব দিঘি সুরক্ষা ও পুরনো রূপে ফিরিয়ে আনা জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) জরিপে নগরীতে ৩৬টি পুকুর ও দিঘির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে নগর বর্ধিত হয়ে ৪২টি ওয়ার্ড হওয়ার পর সে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই। এমনকি সিটি করপোরেশনের কাছেও নেই। সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী পুকুর ও দিঘির হিসাব স্পষ্ট করার জন্য ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করেছিলেন। তবে সেটা ছিল কমিটি গঠনেই সীমাবদ্ধ। এর কোনো কার্যক্রম প্রকাশ্যে আসেনি।
ইতিহাস বলছে, পরিব্রাজক ইবনে বতুতা সিলেটের নাম দিয়েছিলেন ‘সিলিচাতুলা’, অর্থাৎ সাগরের শহর। শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নদী, ছোট-বড় ছড়া, দিঘি মিলেই তিনি সিলেট শহরকে দেখেছিলেন সাগরের মতো। তবে সেই শহরটিই আজ দিঘিশূন্য।
মাছুদিঘিরপাড়ের বাসিন্দা মো. আলতাফ হোসেন লস্কর জানান, তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে দিঘির পানির শব্দে। সাঁতার শিখেছেন এ দিঘিতে। এখন আবর্জনায় ভরে গেছে দিঘি। তালতলায় একটি হোটেলর সুয়ারেজ লাইনের সংযোগ দিঘিতে দেয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আহমাদ সেলিম জানান, বেশ কয়েকজন তরুণ দিঘি রক্ষায় ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার কাজ করছেন। তাদের দাবি মাছুদিঘির চারপাশে অন্তত ১৫টির মতো ঘাট ছিল। এখন ঘাটও নেই, দিঘির অর্ধেকও নেই।
নগরীতে লালদিঘি, রামেরদিঘি, মাছুদিঘি, বেকাদিঘি, মজুমদার দিঘি, দস্তিদার বাড়ি দিঘি, সাগরদিঘি, চারাদিঘি, ধোপাদিঘি, রাজার মাই দিঘি, মুরারীচাঁদ দিঘি, ইন্দ্রানীর দিঘি, কাজলদিঘি, কাস্টঘর দিঘি, কাজিরদিঘি, ব্রাহ্মণশাসন দিঘি, লালাদিঘি একসময় উল্লেখযোগ্য দিঘিগুলোর মধ্যে ছিল। এগুলো সিলেট নগরবাসীর জন্য শুধু পানির উৎসই ছিল না, ঐতিহ্যের নিদর্শনও ছিল। দিঘির মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি এখনো টিকে আছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কিছু সংস্কার হয়েছে। কিছু দিঘি এখনো পড়ে আছে অযত্নে আর বেদখল হয়ে।
বেলার জরিপে পাওয়া ৩৬টি দিঘির অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। তবে এখনো টিকে থাকা অন্যতম বড় একটি দিঘির নাম মাছুদিঘি। নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ড ও আশপাশের বেশ কয়েকটি মহল্লার মানুষ ব্যবহার করত এ দিঘির পানি। শীত মৌসুমে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির অভয়াশ্রয় ছিল দিঘিটি। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে দিঘিটি দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা আখতার বলেন, ‘নগরীতে ৩৬টি পুকুর ও দিঘির অস্তিত্ব পেয়েছিল বেলা। তবে নগর বর্ধিত হয়ে ৪২টি ওয়ার্ড হওয়ার পর সে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই। সিটি করপোরেশনের কাছেও নেই। দিঘিগুলো রক্ষায় আমরা সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছি। প্রশাসনিক কঠোরতাও দরকার।’
মাছুদিঘি রক্ষা প্রসঙ্গে শাহ শাহেদা আখতার বলেন, ‘সিলেটের অন্যসব দিঘির মতো মাছুদিঘির দিকেও আমাদের সুদৃষ্টি আছে। তবে এলাকার মানুষের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। কখনো ডাকলে সবাইকে একসঙ্গে পাই না।’
নগরীর লালদিঘিরপাড় ও সিটি সুপার মার্কেট নামে যে দুটি মার্কেট রয়েছে সেটি গড়ে উঠেছে দিঘি ভরাট করে। লালদিঘি ভরাট করে তৎকালীন সিলেট পৌরসভা মার্কেট নির্মাণ করা হয়। ওই সময়ই বেকাদিঘি ভরাট করে নির্মাণ করা হয় জালালাবাদ পার্ক। বর্তমানে এ দুটি দিঘির অস্তিত্ব নেই। এছাড়া ধোপাদিঘি ভরাট করে গড়ে উঠেছে বেশকিছু দোকানপাট। দিঘির একাংশ ভরাট করে সিটি করপোরেশন পার্ক ও মসজিদ নির্মাণ করেছে। অবশ্য সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের ফলে দিঘিটি অনেকটা রক্ষা পেয়েছে। নগরীর চারাদিঘি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদ। ওই স্থানে একটি স্কুলও গড়ে উঠেছে। উত্তর কাজিটুলায় বিদ্যুৎ অফিসের ভবন নির্মিত হয়েছে বিশাল দিঘি ভরাট করে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি মালিকানায় থাকা দিঘিগুলোও ধীরে ধীরে ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন।
এ ব্যাপারে পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হাই আল হাদী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিলেট নগরীর দিঘিগুলো কেবল জলাধার ছিল না, প্রতিটি দিঘি ছিল ইতিহাসের অংশ। এখন দিঘিগুলোর অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে। মালিকানা যারই থাকুক, আইনে পুকুর বা দিঘি ভরাট নিষিদ্ধ। জমির শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। তার পরও শহরের পুকুর, দিঘি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বেদখল হয়ে যাওয়া দিঘি উদ্ধারে প্রশানকে আরো কঠোর হতে হবে।’
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নগরীতে কতটা দিঘি আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই। তবে পর্যায়ক্রমে সব দিঘি ও পুকুর নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিসিকের অন্তত ৫০ জন সেবক মাছুদিঘি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছেন। তবে শুধু পরিষ্কার করলে হবে না, এলাকার মানুষকেও দিঘি রক্ষায় আন্তরিক হতে হবে।’