আদানির সঙ্গে বিরোধ

তদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত সালিশি কার্যক্রমে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ আদানি পাওয়ারের বকেয়া বিল নিয়ে (অমীমাংসিত) দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। এ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সিঙ্গাপুরের আদালতে সালিশি কার্যক্রম শুরু করেছে আদানি গ্রুপ।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ আদানি পাওয়ারের বকেয়া বিল নিয়ে (অমীমাংসিত) দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। এ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সিঙ্গাপুরের আদালতে সালিশি কার্যক্রম শুরু করেছে আদানি গ্রুপ। ভারতীয় গোষ্ঠীটির এমন কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার ও আদানি গ্রুপের মধ্যকার এ চুক্তির ন্যায্যতা ও সম্ভাব্য অনিয়ম তদন্তে হাইকোর্ট যে কমিটি গঠন করেছে, সে কমিটির প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত সালিশি কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। গতকাল বিচারপতি মো. বজলুর রহমান ও বিচারপতি উর্মি রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ ২৩৪ মিলিয়ন ডলারের বিল নিয়ে আদানি পাওয়ার ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বিরোধ রয়েছে। এ বিরোধ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে। তবে কোনো পক্ষই এ অমীমাংসিত বিল নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। সর্বশেষ এ বিল নিয়ে আদানির পক্ষ থেকে সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে যেতে বিপিডিবিকে চিঠি দেয়া হয়। যদিও বিপিডিবি আগেই আদানির এ ধরনের মধ্যস্থতায় রাজি নয় বলে জানিয়েছে।

আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনা বা বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আবদুল কাইয়ুম। ৬ নভেম্বর রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এ লিগ্যাল নোটিস পাঠানো হয়। ওই নোটিসে বিপিডিবির চেয়ারম্যান ও জ্বালানি সচিবকে তিনদিনের মধ্যে আদানি গ্রুপের সঙ্গে একতরফা বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা বা বাতিল করতে বলা হয়।

হাইকোর্টের আদেশের পর ব্যারিস্টার এম আবদুল কাইয়ুম সাংবাদিকদের জানান, তদন্ত প্রতিবেদন আসার আগেই যদি সিঙ্গাপুরে আদানি তাদের পাওনা নিয়ে সালিশি কার্যক্রম শুরু করে, তাহলে ওই তদন্তের গুরুত্ব থাকবে না। এ কারণে তারা নিষেধাজ্ঞা চেয়েছেন। তিনি আরো জানান, আদানির সঙ্গে করা চুক্তিতে অনেক অনিয়ম হয়েছে।

বিদ্যুতের অমীমাংসিত বকেয়া বিল নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিপিডিবিকে সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে যাওয়ার আহ্বান করে আদানি। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশে তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকায় আদানির প্রস্তাবে রাজি হয়নি বিপিডিবি।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি করা হয়েছে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ চুক্তির বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে একটি কমিটিও কাজ করছে। এ কমিটি এরই মধ্যে আদানির বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ কমিটি অন্তর্বর্তী একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মাঝামাঝি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশে আদানির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা, তদন্ত কমিটির কাজের অগ্রগতি এবং অনুসন্ধানের বিষয়টি জানিয়ে আদানির সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে অনুরোধ করে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের রেজিস্ট্রারের কাছে ২ নভেম্বর একটি চিঠি পাঠিয়েছে বিপিডিবি।

ওই চিঠিতে বলা হয়, আদানির সঙ্গে বিরোধের ধরন অত্যন্ত জটিল। আর্থিক পরিমাণও অনেক বড়। আদানির অনুরোধ বিবেচনায় নিয়েই বর্তমান পরিস্থিতি এ বিরোধ মধ্যস্থতায় পাঠানোর জন্য উপযুক্ত নয় চিঠিতে উল্লেখ করে বিপিডিবি। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশে কমিটি গঠিত হয়েছে। এসব অভিযোগ আদানির আবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গত ৫ অক্টোবর চিঠি দিয়ে এটি আদানিকেও জানানো হয়েছে এবং তদন্তের জন্য বাড়তি সময় চাওয়া হয়েছে বলে সিঙ্গাপুরের আদালতকে পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নিয়ে আদালতে বিচারাধীন মামলা ও তদন্তের মধ্যে গত ৩১ অক্টোবর বিপিডিবিকে বকেয়া বিল পরিশোধ চেয়ে চিঠি দেয় আদানি। বকেয়া পরিশোধ না করলে ১১ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকির বিষয়টি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। বকেয়া বিল পরিশোধ চেয়ে গত বছরের নভেম্বর থেকে ২০টি চিঠি দিয়েছে আদানি গ্রুপ—এমন বিষয়টিও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

গত ২৭ অক্টোবর বিপিডিবিকে পাঠানো এক চিঠিতে আদানি পাওয়ার জানায়, মোট বকেয়া ৪৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের মধ্যে ২৬ কোটি ২০ লাখ ডলারের কোনো বিরোধ নেই। বিরোধের বাইরে থাকা এ পাওনা পরিশোধে বিপিডিবি ব্যর্থ হলে চুক্তি অনুসারে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত করার অধিকার আছে আদানির। যদিও এরই মধ্যে বিপিডিবি বকেয়া কিছু অর্থ আদানিকে পরিশোধ করেছে। বড় অংশ এ মাসের মধ্যে পরিশোধ করার কথা রয়েছে।

ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গড্ডা জেলায় আদানির নির্মিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে বিপিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি রয়েছে। ২৫ বছর মেয়াদি এ চুক্তির শর্তে কী ছিল তার সবই ছিল অপ্রকাশিত। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যম আদানির সঙ্গে বিপিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির নথি প্রকাশ করে। ওই নথিতে দেখা যায়, বিদ্যুৎ আমদানি, কয়লা ক্রয়সহ চুক্তির কঠিন শর্ত। যেখানে বিপিডিবির বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি জড়িত। চুক্তির এমন কঠিন শর্ত থেকে বিপিডিবির বেরিয়ে আসার বড় কোনো সুযোগও নেই।

আরও