রাজধানীর যানজট কমাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। আগামী ২ সেপ্টেম্বর চালু হচ্ছে প্রকল্পটির বিমানবন্দর-ফার্মগেট অংশ। যদিও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন থেকে বলা হচ্ছে, শহরের ভেতরে র্যাম্প (সংযোগ সড়ক) নামানোর কারণে উড়ালসড়কটি মহানগরীর যানজট বাড়িয়ে দেবে। একই ধরনের শঙ্কার কথা বলছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরাও।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দুটি র্যাম্প নিয়ে মূলত আপত্তি তুলেছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আপত্তি ছিল কাকলী ইন্টারসেকশনসংলগ্ন ডাউন র্যাম্প নিয়ে। সংস্থাটি বলছে, এ সংযোগ সড়কের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট বেড়ে যাবে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আপত্তি জানায় পলাশীর র্যাম্প নিয়ে। তাদের দাবি, এর কারণে ওই এলাকায় যানবাহনের চাপ বহু গুণ বেড়ে যাবে। সম্প্রতি র্যাম্পটির কাজ শুরু হয়েছে।
বিমানবন্দরের কাওলা থেকে উড়ালসড়কের ফার্মগেট পর্যন্ত অংশের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। যান চলাচলের জন্য এটি ২ সেপ্টেম্বর খুলে দেয়া হবে। আর এ অংশে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠা এবং নামার জন্য সংযোগ সড়ক রয়েছে মোট ১৫টি। এর মধ্যে বিমানবন্দর ও বিজয় সরণি এলাকায় দুটি র্যাম্প। তিনটি করে র্যাম্প রয়েছে কুড়িল ও মহাখালীতে। বনানীতে আছে চারটি র্যাম্প। এর বাইরে ফার্মগেটে একটির অবস্থান। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, শুরুতে ১৩টি র্যাম্প চালু করা হবে। চালু হতে যাওয়া অংশটির দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার। র্যাম্পগুলোর মোট দৈর্ঘ্য আরো ১১ কিলোমিটার।
এক্সপ্রেসওয়ের গতিপথের একটি বড় অংশ পড়েছে বিমানবন্দর-কমলাপুর রেলপথ বরাবর। ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল করিডোরে সব মিলিয়ে র্যাম্প থাকছে ৩১টি। এর মধ্যে ১৫টি এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার জন্য, বাকিগুলো নামার। ঢাকার বিমানবন্দর/কুর্মিটোলা, কুড়িল ইন্টারচেঞ্জ, আর্মি স্টেডিয়াম, সৈনিক ক্লাব, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ অ্যাভিনিউ, বিজয় সরণি, সোনারগাঁও মোড়, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, শনির আখড়া এবং পলাশী মোড় থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহন উঠবে। বিপরীতে বিমানবন্দর/কুর্মিটোলা, কুড়িল ইন্টারচেঞ্জ, সেনানিবাস, আর্মি স্টেডিয়াম, সৈনিক ক্লাব, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ অ্যাভিনিউ, সোনারগাঁও মোড়, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, শনির আখড়া, ইন্দিরা রোড ও পলাশী মোড় দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে যানবাহন বের হবে। উড়ালসড়ক থেকে নামার র্যাম্পগুলো শহরের যানজট আরো বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শহর এলাকায় যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার যে সমাধান দেয়ার বদলে উল্টো তা বাড়িয়ে দেয়, তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ ঢাকার বিভিন্ন ফ্লাইওভার। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পগুলোও একই অবস্থা তৈরি করতে যাচ্ছে। এগুলোর কারণে ঢাকার যানজট বাড়বে না কমবে—সে বিতর্কগুলো আমরা ২০১০ সালের দিকেই করেছি। কিন্তু সরকার আমাদের কথায় কান দেয়নি।’
এক্সপ্রেসওয়েটি তৈরি হচ্ছে সরকারের সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধানে। ওই বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের সড়কপথের ধারণক্ষমতা বাড়াবে। অন্যদিকে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে এটি সংযুক্ত হলে ঢাকা ইপিজেড ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের যোগাযোগ আরো সহজ হবে। ফলে ঢাকার যানজট নিরসনের পাশাপাশি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।
সরকারের বৃহৎ প্রকল্পটির একাংশের উদ্বোধন উপলক্ষে গত সোমবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী রাজধানী ঢাকাকে নতুন করে সাজাচ্ছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ২ সেপ্টেম্বর এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট অংশ চালু করা হচ্ছে।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, উদ্বোধন হতে যাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার। থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও পথচারী এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচল করতে পারবে না। অন্যান্য যানবাহনকে এ পথ ব্যবহারে দিতে হবে টোল। সর্বনিম্ন টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা। প্রাইভেট কার, জিপ, মাইক্রোবাস, ট্যাক্সির মতো হালকা শ্রেণীর যানবাহনের জন্য টোলের এ হার ধার্য করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ৬২৫ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে বড় ট্রাকের (ছয় চাকার বেশি) জন্য।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলের জন্য যানবাহনের চারটি শ্রেণী নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হালকা যানবাহনের জন্য সর্বনিম্ন টোল ১০০ টাকা নির্ধারণ হলেও এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার পর শেষ পর্যন্ত গেলে দিতে হবে ১২৫ টাকা। হালকা শ্রেণীর যানবাহনকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল আদায়ের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। এ ভিত্তি টোলের দ্বিগুণ আদায় করা হবে বাস থেকে। এ হিসাবে এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশ ব্যবহারের জন্য বাসের টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ টাকা। আর পুরো এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে হলে দিতে হবে ২৫০ টাকা টোল। একইভাবে ভিত্তি টোলের চার গুণ টোল নির্ধারণ করা হয়েছে মাঝারি (ছয় চাকা পর্যন্ত) ট্রাকের জন্য। এ হিসাবে এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশ ব্যবহার করলে ৪০০ টাকা ও পুরো অংশের জন্য দিতে হবে ৫০০ টাকা। বড় ট্রাকের জন্য (ছয় চাকার বেশি) টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ভিত্তি টোলের পাঁচ গুণ। এ হিসাবে কিছু অংশের জন্য ৫০০ ও পুরো এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারে ৬২৫ টাকা টোল আদায় করা হবে বড় ট্রাক থেকে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা খরচ করে ঢাকার প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি তৈরি করছে থাইল্যান্ডভিত্তিক কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠান ইতালথাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেড, চীনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান শ্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন। এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে গঠন করা হয়েছে ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নামের একটি বেসরকারি কোম্পানি। নির্মাণ-পরবর্তী সাড়ে ২১ বছর টোল আদায় করবে এ কোম্পানি।