সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন

গ্রাহকদের টাকা দেয়া শুরু হচ্ছে আজ

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি, সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাবধারীরা তাদের আমানতের মূল টাকা তুলে নেয়ার সুযোগ পাবেন।

শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক নিয়ে একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তিশ্রেণীর গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবেদন অনুযায়ী আজ থেকে টাকা উত্তোলন করা যাবে। প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছেন গ্রাহকরা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর এসব ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতের অর্থ ফেরত দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন গ্রহণ শুরু করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে আজ থেকে পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধ করা হবে।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত মোট ৭৪ হাজার ২২১ গ্রাহক ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছেন। তবে আবেদনকৃত গ্রাহক ও টাকার পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম বলে জানিয়েছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সাময়িক আমানত উত্তোলনের আবেদনের সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ—উভয় দিক থেকেই প্রাপ্ত পরিসংখ্যান আমাদের প্রাথমিক প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই কম। এটি প্রমাণ করে যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও গ্রাহক আমাদের ওপর আস্থা অটুট রেখেছেন। আমরা ব্যাংকটিকে দাঁড় করাতে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি, সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাবধারীরা তাদের আমানতের মূল টাকা তুলে নেয়ার সুযোগ পাবেন। তবে উত্তোলিত অর্থের বিপরীতে কোনো অর্জিত বা প্রাপ্য মুনাফা দেয়া হবে না। গ্রাহক তার সমুদয় মূল টাকা তুলে নিলে সেটি চূড়ান্ত হিসাব নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই ব্যাংকে কোনো বকেয়া ঋণ বা দায় থাকলে তা ফেরতের অর্থ থেকে সমন্বয় করা হবে আগে।

অন্যদিকে, যেসব গ্রাহক এখনই টাকা না তুলে তাদের হিসাব চালু রাখবেন, তারা চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হারে মুনাফা পেতে থাকবেন। তবে মেয়াদপূর্তির আগে সঞ্চয়ী হিসাব ভাঙলে কেবল মূল টাকা ফেরত মিলবে, অর্জিত মুনাফা পাওয়া যাবে না। কিন্তু আংশিক টাকা উত্তোলন করা হলে অবশিষ্ট জমার ওপর যথারীতি নিয়মানুযায়ী মুনাফা বজায় থাকবে।

প্রাথমিকভাবে শুধু ব্যক্তিশ্রেণীর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণীর আমানত ৬৮ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা।

ব্যক্তিশ্রেণীর সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসির। ব্যাংকটির ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি আমানতের মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণীর আমানতের পরিমাণ ১৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংক পিএলসির মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ৩৪ হাজার কোটি, যার মধ্যে ১৯ হাজার ৬৩০ কোটি টাকাই ব্যক্তিশ্রেণীর। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা আমানতের মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণীর আমানত রয়েছে ১৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসির সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা আমানতের ৭ হাজার ৭৮২ কোটি টাকাই ব্যক্তিশ্রেণীর। আর গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার ৭৫ কোটি টাকা ব্যক্তিশ্রেণীর আমানত রয়েছে।

এসব ব্যাংকের প্রদানকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকায়, যার প্রায় ৮৬ শতাংশই এখন খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ৫১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এর বাইরে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে আরো ১২ হাজার কোটি টাকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে সরকারি ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেয়া হবে।

আরও