বাগেরহাটের সরকারি পিসি কলেজ

শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটে ব্যাহত শতবর্ষী বিদ্যাপীঠের শিক্ষা কার্যক্রম

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত বাগেরহাটের সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র (পিসি) কলেজ।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত বাগেরহাটের সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র (পিসি) কলেজ। বিদ্যাপীঠে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের পাঠদানের জন্য ৬৮টি অনুমোদিত শিক্ষকের পদ থাকলেও ৩৩টিই শূন্য। পাঁচটি ভবনের মধ্যে দুটি এরই মধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ৮৪টি শ্রেণীকক্ষ থাকার কথা থাকলেও চালু রয়েছে মাত্র চারটি। সেগুলোর বেশির ভাগই জরাজীর্ণ। নেই আধুনিক অডিটোরিয়াম, সেমিনার কক্ষ। বিভাগীয় কার্যালয়ের ১১টির মধ্যে পাঁচটির অবস্থাই নাজুক। শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটে নিয়মিত পাঠদান বিঘ্নিত হচ্ছে শতবর্ষী এ বিদ্যাপীঠে। কলেজের বিভিন্ন সংকট সম্পর্কে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো কার্যকর সমাধান আসেনি বলে জানিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯১৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নামানুসারে বাগেরহাট শহরের হরিণখানায় প্রতিষ্ঠিত হয় কলেজটি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে প্রভাষকের পদ রয়েছে ৩৪টি। এর মধ্যে ১৩টি শূন্য। সহকারী অধ্যাপকের ১৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন আটজন। সহযোগী অধ্যাপকের পদ রয়েছে ১৪টি। যার ৯টিই শূন্য। এছাড়া অধ্যক্ষের জন্য নির্ধারিত তিনটি পদের মধ্যে দুটি এখনো খালি পড়ে রয়েছে। পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবনগুলোতে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিনই ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা।

কলেজের শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষক সংকট কলেজের অন্যতম বড় সমস্যা। অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে প্রতি বিভাগে থাকার কথা ১২ জন করে শিক্ষক। সেখানে কোনো কোনো বিভাগে আছেন মাত্র একজন। আবার কোনো বিভাগে দুই-চারজন শিক্ষক দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে একই শিক্ষককে একাধিক কোর্স ও অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না পর্যাপ্ত পাঠ গ্রহণের সুযোগ। সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্য বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট ও রোভার স্কাউটের কোনো আলাদা ভবন নেই। ১১ হাজার শিক্ষার্থীর পরিবহন সুবিধা বলতে রয়েছে একটি ৪৫ সিটের বাস। নতুন নতুন বিষয়ে ভর্তি সুযোগও সীমিত। মনোবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ, ভূগোল, কৃষি শিক্ষা, ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং, মার্কেটিং এবং পরিসংখ্যান বিষয় চালু না থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারছে না।

বাংলা বিভাগের প্রভাষক তাপশ কুমার চন্দ্র ঘরামী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আবাসিক হল সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীর থাকার জায়গা নেই। থাকার ব্যবস্থা হলে শিক্ষার্থীরা আরো মনোযোগী হতে পারবে। পুরনো জনবল কাঠামো ও জীর্ণ ভবন দিয়ে শিক্ষার মান টিকিয়ে রাখা কঠিন। আমরা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। শিক্ষক নিয়োগ, নতুন ভবন নির্মাণ ও বিভাগ চালুর বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান সরদার রইস উদ্দিন বলেন, ‘আমার বিভাগে শিক্ষার্থী আছে, কিন্তু শিক্ষক নেই। ব্যবস্থাপনা বিভাগের শক্তিশালী উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও আমরা সবচেয়ে বেশি সংকটে। বিভাগ চালাতে গিয়ে প্রতিদিনই চাপের মধ্যে থাকতে হয়। এ সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’

শিক্ষার্থীরা বলছেন, শুধু ক্লাসরুম সংকট নয়, পুরো পরিবেশটাই সংকটে রয়েছে। ভবনগুলোর ভগ্নদশা। সেমিনার হল নেই। এসব কারণে পড়াশোনার মান প্রতিদিনই কমছে।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত বলেন, ‘পরিত্যক্ত ভবন দেখে ভয় লাগে। কিন্তু নতুন ক্লাসরুমের ব্যবস্থা না থাকায় সেখানেই পড়তে হয়। নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সব সময়ই চিন্তায় থাকি।’

উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহিন আক্তার বলেন, ‘ভবন সংকট এখন এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে ক্লাস করতে গেলেই মনে ভয় কাজ করে। পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে ফাটল, ছাদ খসে পড়া, দেয়াল ভেজা সব মিলিয়ে আতঙ্ক নিয়ে ক্লাসে ঢুকতে হয়। নতুন ভবন ছাড়া এ সংকট কাটবে না।’

সার্বিক বিষয়ে সরকারি পিসি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ জিয়াউল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভবন, শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষকস্বল্পতাসহ অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আলোচনা হয়েছে। লিখিতভাবেও জানানো হয়েছে। এত বড় প্রতিষ্ঠানে এত শিক্ষার্থী, কিন্তু সুবিধা আগের মতোই রয়ে গেছে। এ অবস্থায় মানসম্মত শিক্ষা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন ভবন, আরো শ্রেণীকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, সেমিনার হল এখনই প্রয়োজন। বিভাগীয় সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকট শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গ করছে। দক্ষিণাঞ্চলের এ বাতিঘর দেশের হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব বহন করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অথচ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল না থাকায় সম্ভাবনাময় একটি প্রতিষ্ঠানের মান ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

আরও