শুরুটা হয় উদ্যোক্তার হাতে। একটা সময় পর্যন্ত নিজের কাছে নিয়ন্ত্রণ রাখলেও ব্যবসা বড় হলে একপর্যায়ে পেশাদার কর্মীর হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ভার ছেড়ে দেন মালিকরা। বিশ্বের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানই এভাবে চলছে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সাবেক অধ্যাপক নোয়াম ওয়াজারমেন ২১২টি আমেরিকান স্টার্টআপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর বয়স তিন বছর হওয়ার পর ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠাতা সিইওর পদ ছেড়ে দিয়েছেন। চার বছরের মাথায় ৪০ শতাংশ প্রতিষ্ঠাতা সিইওর পদে ছিলেন। আর পুঁজিবাজারে আসার সময় প্রতিষ্ঠাতা সিইওদের সংখ্যা ছিল ২৫ শতাংশেরও কম। তবে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে এ চর্চা নেই বললেই চলে। এখানে যাত্রার সাত দশক পেরিয়ে গেলেও হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিজ হাতে রেখেছেন উদ্যোক্তারা। এক্ষেত্রে পেশাদার প্রধান নির্বাহীর সংকট থাকায় এখনো ব্যবসার গুরুদায়িত্ব মালিকদেরই সামলাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ছোট থেকে অনেক বড় হয়েছে দেশের ওষুধ শিল্প। আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির পাশাপাশি বছরে ২৩ হাজার কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হয় দেশে। এ খাতের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালসে পেশাদার সিইও রয়েছেন। বাকি সাতটি তথা স্কয়ার, ইনসেপ্টা, রেনাটা, এসকায়েফ, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, অ্যারিস্টোফার্মা, অপসোনিন ফার্মা এখনো সরাসরি মালিকরাই পরিচালনা করেন। শুধু এ সাতটি নয়, ওষুধ শিল্পের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন মালিকরা।
১৯৫৮ সালে স্যামসন এইচ চৌধুরীর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করেছে কোম্পানিটি। দেশের ওষুধ খাতের শীর্ষ এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও পদে রয়েছেন স্যামসন এইচ চৌধুরীর ছেলে তপন চৌধুরী।
একইভাবে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল মুক্তাদির। গত বছর কোম্পানিটির ওষুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা।
১৯৭২ সালে যাত্রা করা ফাইজার বাংলাদেশ ১৯৯৩ সালে মালিকানা পরিবর্তনের পাশাপাশি নাম পরিবর্তন করে রেনাটা লিমিটেড হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সৈয়দ হুমায়ুন কবীরের ছেলে সৈয়দ এস কায়সার কবীর ২০০২ সাল থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওর দায়িত্বে রয়েছেন। ২০১৯ সালে ১ হাজার ২৪১ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে রেনাটার।
দেশভাগের কয়েক বছর পর আব্দুল খালেক খানের হাত ধরে ১৯৫৬ সালে যাত্রা হয় অপসোনিন ফার্মার। বর্তমানে তারই ছেলে আব্দুর রউফ খান কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে আছেন। গত বছর কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কোম্পানি স্মিথক্লাইন অ্যান্ড ফ্রেঞ্চকে (এসকেএফ) অধিগ্রহণের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে যাত্রা করে এসকায়েফ বাংলাদেশ। কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমানের মেয়ে সিমিন রহমান দীর্ঘদিন ধরেই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওর দায়িত্বে রয়েছেন। ২০১৯ সালে ৯৩৯ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করেছে কোম্পানিটি।
ডা. এমএম আমজাদ হোসেনের উদ্যোগে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ইনকরপোরেটেড হয় ১৯৭৪ সালে। তার ছেলে এমএ হায়দার হোসেন বর্তমানে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৯ সালে কোম্পানিটির বিক্রি ছিল ১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা।
১৯৮৬ সালে এম এ হাসানের হাত ধরে যাত্রা শুরু অ্যারিস্টোফার্মার। এখন পর্যন্ত তিনিই এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ২০১৯ সালে ৯৬০ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করেছে কোম্পানিটি।
প্রতিষ্ঠাতা সিইও নাকি পেশাদার সিইও কোম্পানি পরিচালনার জন্য ভালো—বৈশ্বিকভাবে দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে সে বিতর্ক। তথ্য, উপাত্ত ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাতা সিইও এবং পেশাদার সিইওদের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করেছে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পেশাদার সিইওরা প্রতিষ্ঠাতা সিইওদের চেয়ে সফলভাবে ব্যবসা কিংবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সাবেক অধ্যাপক নোয়াম ওয়াজারমেন ‘দ্য ফাউন্ডারস ডিলেমা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, সবাই বিল গেটস, ফিল নাইট কিংবা আনিতা রড্রিকের মতো উদ্যোক্তা হতে চান, যারা বড় কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং অনেক বছর ধরে সেগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন। যদিও একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে উদ্যোক্তা ও সিইও হয়েছেন এমন নজির খুব কম।
অবশ্য প্রতিষ্ঠাতা সিইওদের পক্ষেও অভিমত দিয়েছেন কেউ কেউ। আমেরিকার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম অ্যান্ডারসন হরইটজের সহপ্রতিষ্ঠাতা বেন হরইটজের মতে, উদ্যোক্তারা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যদিকে পেশাদার সিইওরা ভালো সুযোগ-সুবিধা পেলে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যান। কিন্তু উদ্যোক্তারা নিজের প্রতিষ্ঠানকে ফেলে রেখে যান না। এদিক থেকে পেশাদারদের তুলনায় প্রতিষ্ঠাতা সিইওরা এগিয়ে থাকবেন।
শীর্ষ নির্বাহীদের বিষয়ে ‘ডু গুড অন্ট্রাপ্রেনিউরস মেক গুড সিইওস’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বর্তমানে এমন অনেক কোম্পানির উদাহরণ রয়েছে যেখানে প্রতিষ্ঠাতারাই সিইওর ভূমিকায় রয়েছেন এবং কোম্পানিকে সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই সফলভাবে দীর্ঘদিন কোম্পানির সিইওর দায়িত্ব পালন করেছেন। কিংবা ফেসবুকের সিইও জাকারবার্গের কথাও বলা যায়, যিনি পেশাদার সিইওর পরিবর্তে নিজেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তবে সব উদ্যোক্তা তাদের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রাত্যহিক নেতৃত্ব দেয়ার জন্য মানানসই নয়। উদ্যোক্তারা নিত্যনতুন ধারণা নিয়ে কাজ করেন, সেটিকে ব্যবসার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেন এবং একদল কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যান। যেকোনো ব্যবসাকে একটি কাঠামো বা ভিতের ওপর দাঁড় করানো পর্যন্ত মূল ভূমিকা থাকে উদ্যোক্তার। কিন্তু যখন ব্যবসা দাঁড়িয়ে যাবে তখন এর পরিচর্যা, ব্যবস্থাপনা ও প্রবৃদ্ধির দায়িত্ব বর্তায় পেশাদার সিইওর ওপর। এটিই তার কাজ এবং এজন্য তিনি জীবনভর যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করেছেন।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর সিইওদের মধ্যে পেশাদারদের আধিক্যই লক্ষণীয়। কোম্পানিগুলোর উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক মডেল সফল করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তাদের। এক্ষেত্রে সানোফির সাবেক সিইও অলিভার ব্র্যান্ডিকার্ট, গিলিয়াড সায়েন্সের সিইও জন মিলিগান ও জনসন অ্যান্ড জনসনের সিইও আলেক্স গোরস্কির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা কভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জকে সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করে উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে কোম্পানিকে বড় অংকের মুনাফা এনে দিয়েছেন। কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা ওষুধ খাতের গবেষণার ধরনেও পরিবর্তন এনে দিয়েছেন। সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগ বেছে নেয়ার দক্ষতার কারণেই বৈশ্বিক ফার্মা ইন্ডাস্ট্রিতে তারা আজকে আলোচিত হচ্ছেন।
২০৩৩ সাল পর্যন্ত পেটেন্ট সুবিধায় ছাড় থাকলেও এর পর থেকে বাংলাদেশের ওষুধ খাতকে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। আর এক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও গবেষণার মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা ও দক্ষ পেশাদার প্রধান নির্বাহীদের সম্মিলিতভাবে নেতৃত্ব দিতে হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিষ্ঠান বড় হয় পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালনার বদৌলতে। আর ব্যবসা যতই বিকশিত হয় ততই বেড়ে যায় পেশাদারিত্বের প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশে ব্যবসার সার্বিক পরিবেশের মসৃণ পথ সৃষ্টিতে অনেক ধরনের অন্তরায় রয়েছে। আছে অনেক ধরনের ঝুঁকিও। এসব মোকাবেলায় মালিকপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। এছাড়া রয়েছে বিনিয়োগ নিশ্চিত করার তাগিদও। কারণ অর্থায়নকারীরা গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মালিকপক্ষের প্রতিনিধির প্রতিই আস্থাশীল। এটিও প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় বাইরের লোক নিয়োজিত করা থেকে বিরত রাখছে মালিকপক্ষকে।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান মূলত পেশাদার লোকবলই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা পরিবারের সদস্যের মতোই দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যবসা পরিচালনায় প্রথম এক বা দুই প্রজন্ম উদ্যোক্তাদেরই থাকতে হয়। ব্যবসার ব্যাপ্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পেশাদার লোকবল প্রয়োজন পড়ে। শুধু ওষুধ শিল্প না সব খাতের ব্যবসায় এর প্রয়োজন আছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক ধরনের ঝুঁকি আছে, যেগুলো ওষুধ শিল্পেও বিদ্যমান। সেগুলো কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হয় মালিকপক্ষকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থায়ন। অর্থায়নকারীরা সব সময় দেখেন যে ব্যবসার পেছনে কে আছে। সেখানে তারা সবচেয়ে নির্ভর ও গ্রহণযোগ্য মানুষটিকেই প্রত্যাশা করেন। মসৃণ বিনিয়োগের স্বার্থেই অর্থায়নকারীরা এমন প্রত্যাশা রাখেন। এছাড়া মালিকপক্ষের বাইরের কেউ ব্যবসা পরিচালনা করলে অনেক বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। সার্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে মালিকপক্ষের সরে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশের ব্যবসাবিষয়ক গবেষকরাও কিছুটা একই সুরে কথা বলছেন। তাদের মতে, দেশের ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা ব্যবস্থাপনা ও নির্বাহী পদে থাকলেও এক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। যেমন বেক্সিমকো চালাচ্ছেন মালিকপক্ষের বাইরের নির্বাহীরা। এসিআইয়ের ক্ষেত্রেও তাই। স্কয়ারের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের যারা রয়েছেন কিন্তু তাদের থাকতে হচ্ছে খুবই জটিল সমস্যা মোকাবেলার জন্য। স্কয়ারে বর্তমানে যিনি দায়িত্বে আছেন তিনি ওই প্রতিষ্ঠানেই বিক্রয় বিভাগের কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিলে তাকে ওষুধ শিল্পের একজন পেশাদার কর্মী বলা ভুল হবে না। রেনাটার বর্তমান মালিকও তা-ই। ইনসেপ্টার চেয়ারম্যান ও এমডি আবদুল মুক্তাদিরও অন্য প্রতিষ্ঠানে পেশাদার কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। এদের সবাইকে ওনার-ম্যানেজার বলা যায়। অর্থাৎ বলা যাবে না যে ওনার চালাচ্ছেন, কারণ তারা অত্যন্ত পেশাদার। শুধু মালিকনির্ভর চিত্রটি এখন অনেকটাই বদলেছে, বিশেষ করে ওষুধ শিল্পে। ওষুধ শিল্প পরিচালনায় পেশাদারিত্ব অনেক বেশি, কারণ এখানে হোয়াইট কালার ওয়ার্কার বেশি। তবে এখনো ব্যবসা পরিচালনায় যারা মালিকপক্ষের বাইরে যাওয়ার মানসিকতা রাখেন না তারা মূলত অভিজ্ঞ লোকবলের ঘাটতির কারণে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, তিন ভাগে বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে। একটা হলো পিওর ম্যানেজার। আরেকটি হলো ওনার ম্যানেজার। আর শেষটি হলো ওনার ম্যানেজার-অন্ট্রাপ্রেনিউর, অর্থাৎ যিনি উদ্যোক্তা তিনিই মালিক এবং এখন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেও তিনিই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওনার-ম্যানেজার হওয়াটা ভালো। কিন্তু সমস্যাটা হয় যখন ওনার নিজেকে ওনার হিসেবে ট্রিট করেন। ওনার যদি মনে রাখেন যে তিনি একজন পেশাদার ব্যবস্থাপক তাহলেই তিনি পেশাদারিত্বের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মে যিনিই আসুন না কেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মালিকের হাতেই থাকবে। কিন্তু তারা যদি ব্যবসা রূপান্তরে পেশাদার না হন তখন সেটা হবে ভয়াবহ। ওনারদের নিজেদের ব্যবসায়ই প্রশিক্ষিত হতে হবে। নিজ ব্যবসায় প্রশিক্ষিত হওয়ার পরই তাদের ব্যবস্থাপনায় আসা উচিত।
ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত হওয়ার গুরুত্ব অস্বীকার করছেন না ওষুধ শিল্প মালিকরা। তবে ব্যবসার খুঁটিনাটি ঝুঁকি এবং পদ্ধতিগত জটিলতার বিষয়টিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, জটিলতা মোকাবেলা করে ওষুধ শিল্পকে এগিয়ে নিতে মালিকপক্ষের বাইরে থেকে নির্বাহী পদে লোক নিয়োগ খুব স্বস্তির না। আস্থার বিষয় যেমন থাকে, তেমনি অভিজ্ঞ লোকবলের ঘাটতিও আছে।
একমি ল্যাবরেটরিজের এমডি মিজানুর রহমান সিনহা বণিক বার্তাকে বলেন, ওষুধ শিল্প খুব জটিল একটি শিল্প। আমাদের এত বেশি খুঁটিনাটি দেখতে হয়, সেগুলো এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজনটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারের কাছে বারবার আমাদের সহযোগিতা চাইতে হয়। বাইরের এমডি আর ঘরের এমডি কোনো তফাত হয় না? আমরা যারা বিশেষ করে ওষুধ শিল্পের তারা নিজেরাই সিইও ও এমডির দায়িত্ব পালন করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাইরে থেকে নিয়োগ দেয়া হয়। আমি এ পদে কাজ করছি ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। শিল্পের ক্রিটিক্যাল প্রেক্ষাপট আমার পক্ষে যতটা ধরা সম্ভব, ততটা বাইরের কারো ধরা কষ্টকর। এ শিল্পকে ঠিকমতো পরিচালনা করতে নিজেদেরই প্রয়োজন হয়। এছাড়া এ খাতে সঠিক জনবল পাওয়াটাও মুশকিলের। পাওয়া গেলেও তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় শিফট হওয়ার ঘটনা নিয়মিত। সব প্রেক্ষাপটেই আমাদের অনেক বেশি নজর রাখতে হয় ব্যবসা পরিচালনায়। আমাদের চেয়েও সক্ষমতা বড় বাংলাদেশের এমন ওষুধ উৎপাদনকারীরাও নিজেরাই ব্যবসা পরিচালনায় নিয়োজিত আছেন, তারা লোক হায়ার করেন না।