প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জরিপ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়নি চট্টগ্রাম বিভাগের অর্ধলাখ শিশু, ৩৫ শতাংশই হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার

চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় ৪৬ হাজারের বেশি শিশু এ বছর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়নি। পর্যাপ্ত বিদ্যালয় না থাকা, পরিবারের আর্থিক সংকট ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে শিশুদের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় ৪৬ হাজারের বেশি শিশু এ বছর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়নি। পর্যাপ্ত বিদ্যালয় না থাকা, পরিবারের আর্থিক সংকট ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে শিশুদের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে না।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের শিশু ভর্তি-সংক্রান্ত জরিপ প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৪৬৪ জন ৫-১০ বছরের অধিক বয়সী শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু ভর্তি হয়নি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হওয়া শিশুদের ৩৫ শতাংশের বেশি অর্থাৎ ১৬ হাজার ৩৫৩ জনই হাওরবেষ্টিত এ জেলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা নোয়াখালী জেলায় ভর্তি হয়নি ৬ হাজার ৭৫৯ জন। তৃতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম জেলা, এখানকার ৫ হাজার ৭৫০ শিশু কোথাও ভর্তি হয়নি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, দেশে গত পাঁচ-ছয় বছরে বিভিন্ন সংকটে বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তির হার তুলনামূলক কমেছে। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে পড়েছে। আবার করোনা-পরবর্তী কয়েক বছরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়ার হার বেড়েছে। চলতি বছরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক মন্দা ভাব প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়বিমুখ করেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৬ হাজার ৩৫৩ শিশুর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হওয়ার জন্য জেলার হাওরকে দায়ী করছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। তাদের দাবি, জেলার নাসিরনগর উপজেলা মূলত হাওরবেষ্টিত হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে শিশুদের আনুষ্ঠানিক ভর্তির প্রবণতা কম। জেলায় ২২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় হাওর এলাকায় অবস্থিত। এ জেলার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিকল্প শিক্ষা কিংবা হাওরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাওরের কারণে নাসিরনগর উপজেলায় শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার কম। বিশেষ করে দুটি ইউনিয়ন বছরের অনেকটা সময় প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন। অধিদপ্তর হাওরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর শিক্ষায় শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ও ঝরে পড়া রোধে বেশকিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিকল্প বিশেষ কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা না গেলে এ অঞ্চলের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ শতভাগে উন্নীত করা কঠিন হবে।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভাগের ১১০টি উপজেলায় চলতি বছর বিদ্যালয়ে গমন উপযোগী শিশুর সংখ্যা (বিশেষ চাহিদাসম্পন্নসহ) ৪০ লাখ ৫৪ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার ৯৭৮ জন। নিট ভর্তির হার ৯৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ৫-১০ বছরের অধিক বয়সী ৫৯ হাজার ৯২৮ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও ঝরে পড়েছে, যার হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ১৩ হাজার ২৫১ শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৫৪৯ জন কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক (চট্টগ্রাম) মো. আতাউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পিছিয়ে পড়া অঞ্চল, বিশেষ করে চর, পাহাড়, হাওরসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোতে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে ভর্তি নিশ্চিত করতে স্যাটেলাইট স্কুল কার্যক্রমসহ একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে। অন্তত দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করতে চেষ্টা করা হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এলাকার কর্ণফুলী নদীপাড়ের শুঁটকি পল্লীতে কাজ করে মো. মোকলেস। ১২ বছর বয়সী মোকলেস কয়েক বছর আগে পরিবারের সঙ্গে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামে এসেছে। আর্থিক অনটনে জীবিকার খোঁজে কাজ করছে শুঁটকি পল্লীতে। মহেশখালীতে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি তৈরির সঙ্গে পরিচিতি থাকায় এখন মাসিক ৭ হাজার টাকা মজুরিতে কাজ করে মোকলেস। মহেশখালীতে স্থানীয় মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষা পেলেও চট্টগ্রামে আসার পর পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়নি।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট এলাকায়ও দেখা মেলে মোকলেসের মতো অনেক শিশুর। এখানকার মোহরা ভারী শিল্প এলাকায় একটি খাবারের দোকানে কাজ করে সুমন মিয়া। জামালপুর জেলা থেকে চট্টগ্রামে আসার পর তারা বাবা ফুটপাতে খাবারের দোকান চালু করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সেই সুমন তার বাবার সঙ্গে দোকানে কাজ করছে। কখনো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তার। গণিতের জ্ঞান না থাকায় ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকার হিসাব নিতে বেগ পেতে হয় তাকে। তবে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাবার কাছে যোগ-বিয়োগের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করছে সুমন।

তথ্যমতে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বিভাগের চট্টগ্রাম জেলায় বিদ্যালয় গমন উপযোগী শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৯ লাখ ৮০ হাজার ৫০৩ জন। আর সবচেয়ে কম ৭৩ হাজার ৭১২ জন রাঙ্গামাটি জেলায়।

ভর্তি না হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হারও সবচেয়ে বেশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়, ১৪ শতাংশ। সবচেয়ে কম ঝরে পড়া শিক্ষার্থী দশমিক ৪৬ শতাংশ লক্ষ্মীপুর জেলায়। এছাড়া সবচেয়ে বেশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ৩ হাজার ২৯৮ জন চট্টগ্রাম জেলায়; সবচেয়ে কম ১৫২ জন রাঙ্গামাটি জেলায়।

প্রাথমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক মন্দা ভাবে মানুষের কর্মসংস্থান কমছে। প্রান্তিক অঞ্চলেও এর প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের পরিবর্তে পরিবারের উপার্জনে হাত লাগাচ্ছে বিদ্যালয়ে গমন উপযোগী শিশুরা। আবার শিক্ষিত বেকারের হার বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারে কারিগরি শিক্ষা কিংবা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শিশুদের সম্পৃক্ত করার প্রবণতা বাড়ছে। এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা। এসব কারণে চট্টগ্রাম বিভাগে বিদ্যালয়ে ভর্তি উপযোগী প্রায় অর্ধলাখ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়নি বলে মনে করছেন তারা।

আরও