উন্নত জাতের গাভী পালন

বদলে যাচ্ছে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের ৬০০ পরিবারের জীবনমান

উন্নত জাতের গাভী পালনেই বদলে যাচ্ছে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান। এতে বন্যা, খরা ও নদীভাঙনে যুগের পর যুগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলো স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। এ কাজে সহযোগিতা করছেন স্থানীয় বেসরকারি একটি সংস্থা ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

উন্নত জাতের গাভী পালনেই বদলে যাচ্ছে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান। এতে বন্যা, খরা নদীভাঙনে যুগের পর যুগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলো স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। কাজে সহযোগিতা করছেন স্থানীয় বেসরকারি একটি সংস্থা প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চলের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। স্বাধীনতার পর থেকে এসব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কাজ করলেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি এসব মানুষের। তবে এবার স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের একটি উদ্যোগ চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। তাদের সহযোগিতায় জেলার রৌমারী রাজীবপুর উপজেলার চরাঞ্চলের ৩০টি গ্রামের ছয় শতাধিক পরিবার উন্নত জাতের গাভী পালন করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গণ উন্নয়ন কেন্দ্র ২০১৫ সাল থেকে চরবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে রৌমারী রাজীবপুর উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মানুষকে উন্নত জাতের গাভী পালনে উদ্বুদ্ধ করতে কাজ শুরু করে। বিশেষ করে চরের নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত জাতের গাভী পালনে উৎসাহিত করে তোলে।

রৌমারী উপজেলার বাইশপাড়াচর গ্রামের আমিনা বেগমের বয়স ৩৫ বছর। তার বাড়ির উঠানেই গোয়াল ঘর। সেখানে চোখে পড়ে ছোট-বড় আটটি উন্নত জাতের গরু। তিনি বলেন, ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমাদের একটি দেশী গরু ছিল। পরে ২০১৫ সালে গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশী গরুটি বিক্রি করে দিই। কিন্তু তাতে বিদেশী গাভী কেনা সম্ভব হয়নি। পরে গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের সহযোগিতায় ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে কিছু টাকা লোন নিয়ে একটি উন্নত গাভী কিনি। চার-পাঁচ বছরে আমাদের গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টি। এর মধ্যে পাঁচটি বিক্রি করে দিয়েছি। ব্যাংকের লোন পরিশোধ করে আবারো লোন নিয়েছি। ব্যাংকের লোকজন প্রথমে লোন দিতে না চাইলেও এখন তারা নিজেরাই আরো বেশি টাকা লোন দিতে চাচ্ছে। প্রতিদিন দুধ বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিয়ে ১২০০ টাকা রোজগার হচ্ছে।

একই গ্রামের গোলজার হোসেনের স্ত্রী মোছা. ফিরোজা বেগম (৪০) বলেন, আগে আমার খুব অভাব ছিল। অন্যের বাড়িতে, জমিতে কাজ করতাম। তখন নিজেও ঠিকমতো খেতে পারি নাই, ছেলে-মেয়েদেরও খাওয়াতে পারি নাই। লেখাপড়া শেখাতে পারি নাই। পরে প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যাংক থেকে লোন নেই। লোনের টাকা দিয়ে পাঁচ বছর ধরে উন্নত জাতের গাভী পালন করছি। পাঁচ বছরে আমার গোয়ালে গরুর সংখ্যা বেড়ে ১৫টি হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি বিক্রি করে দিয়েছি। প্রতিদিন দুধ বিক্রি করে দেড় হাজার টাকা পাই।

শুধু আমিনা বেগম ফিরোজা বেগমের নয়। অবস্থা ফিরেছে ৩০টি গ্রামের প্রায় প্রতিটি অসচ্ছল পরিবারের। তারা এখন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠছেন।

গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের রিকল প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. মুনির হোসেন জানান, এখানকার চরাঞ্চলের মানুষকে উন্নত জাতের গাভী পালনে উদ্বুদ্ধ করতে এবং স্বাবলম্বী হওয়ার ব্যাপারে প্রশিক্ষণসহ নানাভাবে উৎসাহিত করে তোলা হয়েছে। গণ উন্নয়ন কেন্দ্র তাদের ব্যাংক লোনের ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। এভাবেই রৌমারী রাজীবপুর উপজেলার নয় ইউনিয়নের ৩০টি গ্রামের ছয় শতাধিক পরিবার উন্নত জাতের গাভী পালন করছে। তারা কেনা ফিডের পাশাপাশি চরের ঘাস খাওয়াচ্ছে। নিজেরাই গাভীর দুধ সংগ্রহ করে মিল্ক কালেকশন সেন্টারে দিয়ে আসছে। প্রতিদিনই তারা দুধ বিক্রি করে আয় করতে পারছে। এতে করে চরের এসব পরিবার স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।

জেলার সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারকে সহজ শর্তে লোন দিয়ে উন্নত জাতের গাভী পালনে সহায়তা করা গেলে একদিকে যেমন থাকবে না দারিদ্র্য, অন্যদিকে দেশে দুধ মাংসের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও