অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রতি জেলায় একটি করে নদী দূষণমুক্ত করে পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে কাজের ধারাবাহিকতায় সংকটাপন্ন ১৮টি নদী নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। আগামী অক্টোবর থেকে নদী পুনরুদ্ধারের দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে দূষিত ১৮ নদী পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এজন্য প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭২০ কোটি টাকা। কাজের সুবিধার জন্য প্রতিটি নদীর আলাদা প্রকল্প নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয় সূত্র।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৬৪ জেলার ৬৪টি নদী পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের টার্গেট নিয়েছে সরকার। সে কাজের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে বিপন্ন ১৮ নদী নিয়ে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নদীগুলো হলো গাজীপুর জেলার লবণদহ, নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া, রংপুরের শ্যামাসুন্দরী, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, চট্টগ্রামের হালদা, কক্সবাজারের বাঁকখালী, খুলনার সালতা, রংপুরের আলাইকুড়ি, কিশোরগঞ্জের মগড়া, বগুড়ার করতোয়া এবং নাটোরের বারনই, বরিশালের কীর্তনখোলা, হবিগঞ্জের সুতাং ও খোয়াই। এছাড়া ঢাকার তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও টঙ্গী খালও রয়েছে এ তালিকায়।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ১৮টি নদী নিয়ে কাজ শুরু করেছি। প্রতিটি নদীর জন্য ছোট ছোট প্রকল্প করা শেষ হয়েছে। সবগুলোর ডিপিপি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিছু অনুমোদিত হয়েছে, অন্যগুলোর সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ আছে। আগামী অক্টোবর থেকে কোনো কোনো জায়গায় কাজ শুরু হয়ে যাবে।’
জানা গেছে, এ নদীগুলো নিয়ে ব্যাপক কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, যেসব পয়েন্টে দখল আছে, সেখানে দখল উচ্ছেদ করা হবে। যেখানে দূষণ আছে দূষণ ও দূষণের উৎসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেখানে নদী ভরাট হয়ে গেছে সেখানে খনন করা হবে।
নদীর এ কর্মযজ্ঞের জন্য বাজেটও নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, একেক নদীর জন্য একেক রকম বাজেট হচ্ছে। সে হিসেবে কোনো নদীর জন্য ৩০ কোটি টাকা বাজেট করা হয়েছে। আবার কোনো নদীর জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে কোনো নদীর বাজেটই ৫০ কোটি টাকার ওপরে যাবে না বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
১৮টি নদী খননসহ পুনরুদ্ধার করতে মোট কত টাকা খরচ হতে পারে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি নদীর জন্য গড়ে ৪০ কোটি টাকা করে বাজেট রাখা হচ্ছে। সে হিসেবে ১৮টি নদীর জন্য ৭২০ কোটি টাকা। প্রাথমিকভাবে এটাই সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
দেশের দূষিত নদীগুলো নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) একটি গবেষণা করেছিল ২০২২ সালে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে। সেখানে দেখা যায়, লবণদহ, হাঁড়িধোয়া এবং সুতাং দেশের সবচেয়ে দূষিত নদী।
ওই গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষণা দলের সদস্যরা জানান, নদীর স্বাস্থ্য ও জলজ চরিত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দূষণের মূল চারটি প্যারামিটার সামনে রেখে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এক্ষেত্রে পানির জারক প্রকৃতি, দ্রবীভূত অক্সিজেন, জৈব অক্সিজেনের চাহিদা (বিওডি) ও রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা (সিওডি) পরিমাপ করে নির্ণয় করা হয় নদ-নদীর দূষণ।
গবেষণার তথ্যমতে, সবচেয়ে দূষিত তিন নদীর পানির গুণাগুণ প্রায় সমান। লবণদহ, হাঁড়িধোয়া ও সুতাংয়ে পানির ক্ষারতার পরিমাণ যথাক্রমে ৫, ৪ দশমিক ১ ও ৪। পানিবিজ্ঞানীদের মতে, বিশুদ্ধ পানির পিএইচ বা ক্ষারের পরিমাণ ছয় থেকে সাতের মধ্যে থাকতে হয়। এর কম হলে পানিকে আম্লিক এবং বেশি হলে ক্ষারীয় বলা হয়। পিএইচের মাত্রা বেশি ও কম দুটোই মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
তিন নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ভয়াবহ রকম কম। লবণদহে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য দশমিক ২১, হাঁড়িধোয়ায় শূন্য দশমিক ৬ ও সুতাংয়ে শূন্য দশমিক ৪। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পানিবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ অবশ্যই ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ মাত্রায় থাকতে হবে। নয়তো জলজ প্রাণী বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি রংপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খাল দূষণ ও দখল থেকে রক্ষায় বিবাদীদের ব্যর্থতা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন হওয়ায় কেন তা অসাংবিধানিক, বেআইনি এবং বিধিবহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রুলে সিএস জরিপ ও মূল প্রবাহ অনুযায়ী খালের সীমানা নির্ধারণ, স্থানীয় বাসিন্দাদের চাষাবাদ ও মৎস্য শিকারের অধিকার সুরক্ষা করতে এবং তাদের জীবন ও জীবিকার মানোন্নয়ন করতে খাল থেকে দখলদার উচ্ছেদ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে খালটি পুনরুদ্ধার করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রুল জারির পাশাপাশি আদালত খালটির মূল প্রবাহ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ, দখলদার উচ্ছেদ, দূষণের উৎস চিহ্নিতকরণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও খালের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে খাল পুনরুদ্ধার করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করার নির্দেশ দেন।
রংপুর জেলার কেল্লাবন্দ এলাকায় শ্যামাসুন্দরী খালের আয়তন প্রায় ১৬ বর্গকিলোমিটার (৪১ দশমিক ৩৯৭১ একর)। খালটি রংপুর সদর উপজেলার কেল্লাবন্দ মৌজায় ঘাঘট নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে নগরীর রঘুনাথ, ভগী, রাধাবল্লভ, আলমনগর, কামালকাছনা, মাহিগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মাহিগঞ্জ রেলব্রিজের পাশে খোকসা নামক স্থানে আবার ঘাঘট নদীতে মিলিত হয়েছে। তবে খালটি দখল করে গড়ে উঠেছে দোকান, ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা। নির্মিত এসব স্থাপনার জন্য খাল সংকুচিত হয়ে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দখলের পাশাপাশি দূষণেও জর্জরিত খালটি। বিভিন্ন স্থানে ড্রেনের তরল বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন, পয়ঃবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য দিয়ে দূষিত হচ্ছে পানি। ফলে খালটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে একটি পচা ডোবায় পরিণত হয়েছে। হারিয়ে গেছে মাছসহ জলজ প্রাণী এবং পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন খালনির্ভর কৃষক ও মৎস্যজীবীরা।
এছাড়া ঢাকার চার নদী—তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও টঙ্গী খালকে আড়াই দশক আগে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপর নদীগুলোর অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হয়েছে। নতুন করে সরকার নদীগুলো পুনরুদ্ধারের প্রকল্প নেয়ায় আশার আলো দেখছেন নদীকর্মীরা।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিপন্ন নদী নিয়ে কাজ করছি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নদী নিয়ে সেভাবে জোরালো কোনো সিদ্ধান্ত আমরা এতদিন দেখিনি। এবার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেভাবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে তাতে আমরা আশাবাদী দেশের নদীর দৃশ্যপটে ভালো পরিবর্তন দেখতে পাব। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই আমলাতন্ত্রের প্রাধান্যের বাইরে গিয়ে নদীকর্মী, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে।’