বিআইবিএমের বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে গভর্নর

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতের কাজ চলছে

দেশের ব্যাংক খাতে সংঘটিত অপরাধ ও সংকটের পেছনে ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতা। এ মন্তব্য করে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ‘ব্যাংক খাত ঠিক করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।

দেশের ব্যাংক খাতে সংঘটিত অপরাধ ও সংকটের পেছনে ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতা। এ মন্তব্য করে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ‘ব্যাংক খাত ঠিক করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। ব্যাংক খাত সংস্কারের পাশাপাশি আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত ও তদারকি বাড়ানোর কাজ করছি।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) দুইদিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গভর্নর এ কথা বলেন। রাজধানীর মিরপুরে প্রতিষ্ঠানটির অডিটোরিয়ামে দশমবারের মতো আয়োজিত এ সম্মেলনের প্রথম দিনে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষক, ব্যাংকারসহ খাতসংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। এবারের সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ভবিষ্যতের ব্যাংকিং’। সম্মেলনটির গণমাধ্যম সহযোগী দৈনিক বণিক বার্তা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশে একটি বড় ও অনেকগুলো ছোট ইসলামী ব্যাংক আছে। এর বেশির ভাগই নানা সমস্যায় জর্জরিত এবং দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমরা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার উদ্যোগ নিচ্ছি। এগুলোকে এক করে দেশে শরিয়াহভিত্তিক দুটি বৃহৎ ব্যাংক গড়ে তোলা হবে। আশা করি, ব্যাংক দুটি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে বড় হতে পারবে।’

ড. মনসুর বলেন, ‘আমাদের যথাযথ ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ কাঠামোও নেই। দেশে প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকিং রীতিনীতিতে নানা ধরনের ফাঁকফোকরও আছে। সেগুলো ঠিক করার কাজ করছি। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের কাজ চলছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় দুই ধরনের বিধিমালা আছে। কিন্তু কোনো দেশেই এটি থাকা উচিত নয়। সব ধরনের ব্যাংকের জন্য একক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো থাকা দরকার। সব ব্যাংকের জন্য আমাদের একক একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করতে যাচ্ছি।’

দেশের ব্যাংক খাতে উদ্ভাবন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোসংক্রান্ত দুই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনের সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে বেগ পেতে হয়। আর বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মতো সঠিক কাঠামো না থাকার কারণে এখানে বিভিন্ন ধরনের দুর্বৃত্তপনা হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতিসহ সুশাসনের ঘাটতির কারণে আমরা কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করেছি এবং সঠিক পর্ষদ পেতে আরো পরিবর্তন করে যাচ্ছি। কোনো ব্যাংকের পর্ষদ যদি সঠিকভাবে কাজ না করে আমানতকারীদের স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধিকার আছে সেখানে হস্তক্ষেপ করার। আমরা তা করছি, ভবিষ্যতেও করে যাব। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।’

গভর্নর বলেন, ‘প্রথম ধাপে আমরা ১১টি ব্যাংকে হস্তক্ষেপ করেছি। গত কয়েক সপ্তাহে আরো দুটি ব্যাংকে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। আবার একটি ব্যাংককে দেখেছি চাপে পড়ে তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবর্তন করছে। আমরা একে স্বাগত জানাই।’

মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার (এমএফএস) দৈনিক লেনদেন শিগগির ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এমএফএসে দৈনিক গড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। শিগগির এটি ৬ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আমরা এ খাতের উন্নয়নে কাজ করছি। ডিজিটাল ব্যাংক, এজেন্ট ব্যাংক ও এমএফএসের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ সহজীকরণেও কাজ করছি।’

বর্তমান সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার এসে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি ব্যাংক ও ব্যাংকের বাইরের বিভিন্ন খাতের মাধ্যমে দেশের বাইরে প্রচুর সম্পদ পাচার হয়েছে। এসব সম্পদ পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করছে। আমরা সব সম্পদ হয়তো পুনরুদ্ধার করতে পারব না। কিন্তু ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কিছু না ঘটে, সেজন্য আমাদের নৈতিক কিছু কাজ করতে হবে। কারো জন্য “‍‌সেফ হোম” বলে কিছু যাতে না থাকে এবং দেশ থেকে এত টাকা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সুযোগ যাতে তৈরি না হয়। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য দেশের বাইরেও তাদের (পাচারকারী) জীবন দুর্বিষহ করে তোলা। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আশা করি এ কাজে সমর্থন দিয়ে যাবে।’

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন কমিশন, কমিটি, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদরা অসংখ্য সংস্কার প্রস্তাব করেছেন। এর পরও অনেক সমস্যার এখনো সমাধান হয়নি। অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য আমাদের নির্দিষ্ট কিছু কাজ করা প্রয়োজন। এগুলো হলো ব্যাপক পরামর্শের মাধ্যমে সংস্কার চূড়ান্তকরণ। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য সংস্কারের নির্দেশিকা ও নীতিমালা প্রণয়ন। সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য নির্বাহী কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ক্ষমতা ও পদায়ন দরকার।’

বিআইবিএমের মহাপরিচালক মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রথম দিনে মোট পাঁচটি প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সেশনে উপস্থাপন করা হয় ছয়টি করে মোট ৩০টি প্রবন্ধ। এর মধ্যে ‘‌ম্যাক্রো ইকোনমি অ্যান্ড সেন্ট্রাল ব্যাংকিং’ শিরোনামে দুটি প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এর একটিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, আরেকটিতে সভাপতিত্ব করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। ‘‌এসএমই ফাইন্যান্সিং অ্যান্ড ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ শিরোনামের প্লেনারি সেশনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এমএ বাকী খলীলী, ‘‌ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট টুওয়ার্ডস অ্যাড্রেসিং ফিউচার চ্যালেঞ্জেস’ নামের প্লেনারি সেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. জাকির হোসেন চৌধুরী। আর ‘‌সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সিং অ্যান্ড দ্য ব্যাংকিং সেক্টর রেজিলেন্স’ সেশনের সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক।

সম্মেলনের দ্বিতীয় তথা শেষ দিনে আজ থাকছে তিনটি প্লেনারি সেশন।

আরও