ভারতে দেশজ বাণিজ্যিক ব্যাংক ৩৩, বাংলাদেশে ৫২টি!

ব্যাংক খাত সংস্কারে ভারতের নীতি অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশ

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারতে দেশজ বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে ৩৩টি। আর বাংলাদেশে এ শ্রেণীর ব্যাংকের সংখ্যা ৫২। গত দুই যুগে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভারতে ব্যাংকের সংখ্যা অন্তত ৪০টি কমানো হয়েছে।

দেশটিতে সরকারি ব্যাংকের সংখ্যা ২৭ থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র ১২টিতে আর বেসরকারি ব্যাংক আছে ২১টি। সংখ্যা কমানো ও করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতের ব্যাংক খাত শক্তিশালী হয়েছে। খেলাপি ঋণের হার নেমে এসেছে মাত্র ২ শতাংশের ঘরে। যদিও এক্ষেত্রে বিগত সময়ে বিপরীতমুখী ছিল বাংলাদেশের যাত্রা। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশেরও বেশি। সরকারি মালিকানাধীন নয়টি ব্যাংকের একটি ছাড়া বাকিগুলোর পরিস্থিতি নাজুক। মূলধন ও সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতিতে থাকা এ ব্যাংকগুলো এখন বড় সংকটে রয়েছে। অনেক বেসরকারি ব্যাংকও ভঙ্গুর দশায়। বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়াকেও এ খাতের একটি সংকট হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, ভারতের বহু নেতিবাচক দিক নির্দ্বিধায় গ্রহণ করলেও ভালো কোনো উদ্যোগকে আমরা অনুসরণ করছি না। গত দুই দশকে ভারতের ব্যাংক খাত ক্রমাগত সুশাসন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দিনে দিনে ভঙ্গুর হয়েছে। সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের শিকার হয়ে বেশির ভাগ ব্যাংকের ভিত নড়বড়ে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার বেসরকারি কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নিলেও সেটি নাজুক পরিস্থিতিতে রেখে গেছে। অন্যদিকে সরকারি ব্যাংক সংস্কার ও পুনর্গঠনে নজরই দেয়নি তারা। এখন নির্বাচিত সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারে ভারতীয় মডেল অনুসরণ করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যেভাবে সরকারি সহায়তানির্ভর হয়ে চলছে, তাতে সেগুলোকে আর ব্যাংকই বলা যায় না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর ধরে সরকারি মদদেই লুণ্ঠিত হয়েছে। এ ব্যাংকগুলোকে কখনই পেশাদারত্বের সঙ্গে চলতে দেয়া হয়নি। অতীতে যেভাবে চলেছে, সেভাবে এখন আর চলার সুযোগ নেই। কারণ এ ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি এখন একেবারেই নাজুক।’

ভারতের মডেলে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখনো পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন মোস্তফা কে মুজেরী। তিনি বলেন, ‘অতীতে ভারতের ব্যাংক খাতের অবস্থা আমাদের মতোই ছিল। গত কয়েক দশকে সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে তারা ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করেছে। ব্যাংক খাত পরিচালনায় সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু আমাদের ব্যাংকগুলো উল্টো পথে হেঁটেছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে আমরা ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছি। এখন দেশের অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংক খাত সংস্কার ও পুনর্গঠনের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সরকারকে নিজের ব্যাংকগুলোকে দিয়েই শুরু করতে হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি ব্যাংক নয়টি, আর বেসরকারি খাতের ব্যাংকের সংখ্যা ৪৩। সে হিসাবে দেশজ বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২টিতে। এ ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১৬টির লাইসেন্স দেয়া হয়েছে গত দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলে। অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতে দেশজ বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা এখন ৩৩। এর মধ্যে ২১টি বেসরকারি খাতের ব্যাংক। বাকি ১২টি ব্যাংক সরকারি মালিকানাধীন। যদিও ভৌগোলিক আয়তন ও জনসংখ্যার বিবেচনায় ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বৃহৎ দেশ।

বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি অনেকগুলো ব্যাংকের অবস্থা এখন নাজুক। এক ডজনের বেশি ব্যাংক রীতিমতো অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ১৫টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। পর্ষদ ভেঙে দেয়া হয়নি, এমন আরো বেশ কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থাও শোচনীয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩০ শতাংশের বেশি খেলাপি ছিল। অবশ্য সেপ্টেম্বরে এ খেলাপির হার ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ।

অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে দুর্বল হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলো একীভূত করতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল। এ অধ্যাদেশের আওতায় শরিয়াহ্ভিত্তিক পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে একটিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত হয়। এর আলোকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির কার্যক্রমও অনেকটা এগিয়ে নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিষয়ে একই ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেটি দৃশ্যমান হয়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন অনুযায়ী, উপযোগিতা হারিয়েছে এমন যেকোনো দুর্বল ব্যাংকই একীভূত করার সুযোগ আছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্তটি সরকারের দিক থেকে আসতে হবে। কারণ এ ব্যাংকগুলোর মালিকানা সরকারের। সরকার যদি কোনো উদ্যোগ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে।’

ভারতে ছয়টি ব্যাংক একীভূত করে ‘স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’র সঙ্গে জুড়ে দেয়ার ঘটনাকে দেশটির ব্যাংক খাত সংস্কারের বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৭ সালে ভারতীয় মহিলা ব্যাংকসহ আঞ্চলিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে দেয়া হয় সরকারি এ বৃহত্তর ব্যাংকটির সঙ্গে। এর আগে ২০০৮ ও ২০১০ সালে আরো দুটি ব্যাংককে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে একীভূত করে দেয়া হয়েছিল। এতে ভারতীয় এ ব্যাংকটির বিস্তৃতি, সম্পদের আকার ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংকের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকটির ব্যবসার আকার ১০৩ লাখ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটিতে গ্রাহকের ৫৭ লাখ কোটি রুপি আমানত রয়েছে। আর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ৪৬ লাখ কোটি রুপি। এ ঋণের মধ্যে ৬ লাখ কোটি রুপি কেবল এসএমই খাতে বিতরণ করা হয়েছে। এত বিপুল ঋণ বিতরণের পরও ভারতীয় এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার এখন মাত্র ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। শুধু সবশেষ প্রান্তিকেই ৩২ হাজার ৮৬২ কোটি রুপি পরিচালন মুনাফা করেছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। আর নিট মুনাফা ছিল ২১ হাজার কোটি রুপির বেশি। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৭১ হাজার কোটি রুপি। ব্যাংকটির সম্পদের বিপরীতে আয়ের (আরওএ) অনুপাত ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। মূলধন বা ইকুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) ২০ শতাংশেরও বেশি।

কেবল পোর্টফোলিওর আকার কিংবা মুনাফায় নয়, বরং নেটওয়ার্ক বিস্তৃতির দিক থেকেও বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়েছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। বিশ্বের ২৯টি দেশে ২৪৪ শাখা অফিস খুলেছে ব্যাংকটি। বিভিন্ন খাতের ২৭টি সাবসিডিয়ারি, আটটি যৌথ উদ্যোগ এবং ১৮টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ব্যাংকটির অর্থায়নে। সাবসিডিয়ারিগুলোর মাধ্যমে ব্যাংকটি বীমা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ব্যাংকিং, কার্ড সেবা ও অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। আর যৌথ উদ্যোগগুলো দেশী-বিদেশী অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন বাজার ও পণ্য উন্নয়নে সহায়তা করছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক, যা ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষি ঋণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা অর্থায়ন এবং গ্রামীণ সঞ্চয় কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। ৫০ কোটিরও বেশি গ্রাহককে সেবা দেয়া স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার শাখা রয়েছে ২৩ হাজারের বেশি। আর ৬৩ হাজারেরও বেশি এটিএম ও প্রায় ৮৩ হাজার ব্যাংকিং করেসপন্ডেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে ব্যাংকটি।

চাকরি সূত্রে বেশ কয়েক বছর ভারতীয় ব্যাংক খাতকে কাছ থেকে দেখেছেন ব্যাংকার ও লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে ভারতে ব্যাংক খাত সংস্কারে নরসিংহম কমিটি গঠিত হয়েছিল। আলোচিত ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দেশটির ব্যাংক খাতে বিপুল সংস্কার করা হয়। এ সংস্কারের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় ব্যাংকগুলোর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। নরসিংহম কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে সে দেশের ব্যাংক খাত। ভারত থেকে বহু আবর্জনা এনেও আমরা গায়ে মাখাচ্ছি, কিন্তু ভালো কিছু নিইনি। এত বৃহৎ ও জনবহুল একটি দেশও তার ব্যাংক সংখ্যা ক্রমাগত কমিয়ে ৩০-এর ঘরে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু আমরা ক্রমাগত ব্যাংকের সংখ্যা বাড়িয়েছি। আশির দশকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া পূবালী ও উত্তরা ব্যাংক সফল হয়েছে। কিন্তু সরকারের মালিকানায় থাকা সবক’টি ব্যাংক এখন নিমজ্জিত।’

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কেবল সরকারি মালিকানা থাকায় টিকে আছে বলে মনে করেন ফারুক মঈনউদ্দীন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যে পরিমাণ অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, তাতে এগুলো বেঁচে থাকার কথা নয়। বিশ্বের কোনো ব্যাংক ৫০ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। দুর্ভাগ্য হলো আমাদের বেশির ভাগ সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অর্ধেকের বেশি। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এ ব্যাংকগুলোর সংস্কারে বিন্দুমাত্র উদ্যোগও নেয়নি। এখন নির্বাচিত সরকার কী করে, সেটি দেখার বিষয়। তবে সরকারকে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তার কি নামকাওয়াস্তে ব্যাংক দরকার, নাকি সত্যিকারের ব্যাংক দরকার।’

সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) বাণিজিক ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১০৭ কোটি টাকাই ছিল খেলাপি। সে হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার এখন ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

অবশ্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপির এ হার প্রায় ৫০ শতাংশ ছিল। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে বছরের শেষ তিন মাসে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমিয়ে এনেছে ব্যাংকগুলো। আর সরকারি বিশেষায়িত তিন ব্যাংক হলো বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। গত বছর শেষে এ তিন ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৪৬ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা ছিল খেলাপি। এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণেরও প্রায় ৪০ শতাংশ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবল সোনালী ছাড়া বাকি সবক’টি ব্যাংকই এখন মূলধন ও সঞ্চিতি ঘাটতিতে রয়েছে। সম্মিলিতভাবে এ ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ এখন ৭০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর মূলধন ঘাটতির পরিমাণও প্রায় একই রকম। অবশ্য অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা বলছেন, আর্থিক প্রতিবেদনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যে তথ্য দিচ্ছে, তার সত্যতা নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে এ ব্যাংকগুলোর অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করা হলে আরো ভঙ্গুর চিত্র উঠে আসবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। সম্প্রতি তিনি এ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আমি অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে সরকারি খাতের ব্যাংকের বিষয়ে বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তার মধ্যে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার বিষয়টিও ছিল। আমি এখনো মনে করি, সরকারের মালিকানায় দুটির বেশি ব্যাংক থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার আদলে আমাদের সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে অন্য দুই-তিনটি ব্যাংক একীভূত করে দেয়া যায়। বাকিগুলোকে পূবালী ও উত্তরা ব্যাংকের মতো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া দরকার। সরকারি ব্যাংকগুলো যেভাবে চলছে, সেটিকে ব্যাংকিং বলা যায় না।’

মুসলিম চৌধুরী আরো বলেন, ‘সরকারি ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে যে পরিসংখ্যান দেখানো হয়, সেটি সত্য কিনা, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত এ ব্যাংকগুলোর অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করা দরকার। একই সঙ্গে ফরেনসিক অডিট করে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে দায়ীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি লোপাট হওয়া অর্থের গন্তব্য খুঁজে বের করতে হবে। ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি বের করে কয়েকটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার উদ্যোগও নিতে হবে।’

দেশে অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও চাহিদার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি বলে বহু আগে থেকেই সমালোচনা রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরোধিতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১২ সালে এক সঙ্গে নয়টি বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়। বেসরকারি খাতের শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতের মৌলিক সংকটগুলোর একটি ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়া। এটি বহুদিন ধরেই অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। সংখ্যা বেশি হওয়ায় ছোট বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে অনেক ব্যাংক অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভুল করেছে। আর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতিগুলো এখন দৃশ্যমান। এ খাতকে শক্তিশালী করতে হলে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জোর দিতে হবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এর কোনো বিকল্প নেই।’

আরও