বেবিচকের ক্যাটাগরি উন্নয়ন

পেমেন্ট জটিলতায় দীর্ঘায়িত এফএএর নিরীক্ষা কার্যক্রম

ফ্লাইট নিরাপত্তায় দুর্বলতার কারণে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) দ্বিতীয় ক্যাটাগরির নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটি (এফএএ)। এর পরের বছরগুলোয় এফএএর চিহ্নিত করা দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে তা থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে বেবিচক। তবে এফএএর মূল

ফ্লাইট নিরাপত্তায় দুর্বলতার কারণে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) দ্বিতীয় ক্যাটাগরির নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটি (এফএএ) এর পরের বছরগুলোয় এফএএর চিহ্নিত করা দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে তা থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে বেবিচক। তবে এফএএর মূল প্রতিনিধি দলকে পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানানোর আগে নিজেদের উন্নতি পর্যবেক্ষণে প্রি-অডিট আলোচনার উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি। প্রি-অডিট আলোচনার জন্য ২০১৯ সালে এফএএর সঙ্গে একটি চুক্তিও করে বেবিচক। চুক্তি অনুযায়ী এফএএর নির্ধারিত ফিও (চার্জ) পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর আলোচনা শুরুও হয়। কিন্তু চার্জের অর্থ পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকায় থেমে যায় প্রি-অডিট আলোচনা। অন্যদিকে কার্যক্রম পরিদর্শনে এফএএ প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানাতে না পারায় দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে বেবিচকের ক্যাটাগরি- থেকে ক্যাটাগরি-- উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়া।

বেবিচক সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রি-অডিট আলোচনার জন্য ২০১৯ সালে এফএএর সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল। এজন্য ফি নির্ধারিত হয় লাখ ডলার, যা ২০২০ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, এফএএর সঙ্গে ৬০০ ঘণ্টা আলোচনা হওয়ার কথা। আলোচনার শুরুতে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর বিষয়ে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে জানতে চান এফএএ কর্মকর্তারা। বেবিচকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করা হয়। কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে সেটি সংশোধনের পরামর্শও দেয়া হয়। সে সময় ১৬০ ঘণ্টা আলোচনার পর পুরো উদ্যোগটি থেমে যায়।

দীর্ঘ বিরতির পর জানা যায়, চুক্তি অনুযায়ী প্রি-অডিট ফির লাখ ডলার না পাঠানোয় আলোচনা বন্ধ রেখেছে এফএএ। পরবর্তী সময়ে বেবিচকের পক্ষ থেকে অর্থ পাঠানোর তথ্য সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হলে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে অর্থ জমা হলেও পেমেন্ট গেটওয়ের সমস্যার কারণে এফএএ সেটি পায়নি। এসবের মধ্যেই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যায় চুক্তির মেয়াদ। ফলে আটকে যায় এফএএর সঙ্গে বেবিচকের প্রি-অডিট আলোচনা।

প্রসঙ্গে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এফএএ বুঝতে পেরেছে যে পেমেন্ট-সংক্রান্ত ভুল বোঝাবুঝির বিষয়টি তাদের সমস্যা। পরে ফি বাবদ পাঠানো পুরো অর্থই তারা ফেরত পাঠায়। পাশাপাশি প্রি-অডিট আলোচনার যে চুক্তি ছিল সেটিও রিভাইস করতে চাচ্ছে তারা। শুধু তা- নয়, এফএএ প্রস্তাব দিয়েছে, প্রি-অডিট আলোচনার জন্য এবার তারা কোনো ফি নেবে না।

বেবিচকের ক্যাটাগরি উন্নয়নের জন্য এফএএর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে মফিদুর রহমান বলেন, মূল অডিটের জন্য তাড়াহুড়ো না করে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এফএএ। কারণ এক্ষেত্রে কোনো অসংগতি থাকলে আবারো দীর্ঘসূত্রতায় পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, ক্যাটাগরি উন্নয়নের যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে, তা অব্যাহত রেখেছে বেবিচক। এফএএ অডিটের পর ক্যাটাগরি উন্নয়নের বিষয়ে আশাবাদী আমরা। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (টিএসএ) রিজিওনাল কর্মকর্তারা বেবিচক বিমানবন্দরের কার্যক্রম পরিদর্শন করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তারাও বলেছেন, এখন এফএএ অডিট করতে পারে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের অডিটের প্রতিবেদনও সন্তোষজনক। ২০১৭ সালের আইকাও অডিটে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে বেবিচক। নিরাপত্তা বিষয়ে বেবিচকের উন্নয়নকে রোল মডেল হিসেবে দেখছে আইকাও।

বেবিচক সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে ঢাকা সফর করে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (টিএসএ) তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। ২৭ ফেব্রুয়ারি টিএসএ সদস্যরা বেবিচকের সঙ্গে বৈঠক করেন। মার্চ পর্যন্ত বিমানবন্দরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন দলটির সদস্যরা। সফরকালে তারা ফ্লাইট অপারেশন ব্যবস্থা, যাত্রী নিরাপত্তা, বিমানবন্দরের কর্মীদের ডিউটির পদ্ধতি, স্ক্যানিং, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ সব ধরনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর মে মাসে বিমানবন্দর পরিদর্শন করে টিএসএর আঞ্চলিক পরিচালকের (সিঙ্গাপুর) নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। তারাও বিমানবন্দরের বিভিন্ন এলাকা, ফ্লাইট অপারেশন ব্যবস্থা, যাত্রী নিরাপত্তা, বিমানবন্দরের কর্মীদের ডিউটির পদ্ধতি, স্ক্যানিং, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ সব ধরনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।

এদিকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো বাড়াতে ইডিএস, ডুয়াল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন, ডুয়াল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন ফর কেবিন উইথ ট্রে রিটার্ন সিস্টেম, আন্ডার ভেহিকল স্ক্যানিং মেশিন এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেক্টর (ইডিটি), লিকুইড এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম ডাবল ক্যাব পিকআপ, ইটিভি কনজিউমেবলস ফর এক্সপ্লোসিভ ট্রান্স ডিটেক্টর মেশিন যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বেবিচক। এর মধ্যে ইডিটিসহ বেশকিছু নিরাপত্তাসামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে টিএসএ কর্তৃপক্ষ।

দেশে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে তিনটি। এগুলো হলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এছাড়া অভ্যন্তরীণ সাতটি বিমানবন্দর কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী, বরিশাল, ঈশ্বরদী, সৈয়দপুর কুমিল্লায় অবস্থিত। এসব বিমানবন্দর উড়োজাহাজের সব ধরনের সেফটি সিকিউরিটি, উড়োজাহাজের সেফটি সিকিউরিটি নিয়ন্ত্রণ এবং অনুমোদন, বৈমানিকদের লাইসেন্স দেয়া, এয়ার ট্রাফিক, এয়ার রুট নিয়ন্ত্রণ, ফ্লাইট অপারেশন কন্ট্রোলসহ আরো নানা বিষয় সরাসরি বেবিচকের পর্যবেক্ষণে থাকে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজের সি-চেকসহ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেবিচক অনুমোদিত হতে হয়। বাংলাদেশের বিমানবন্দর ব্যবহারকারী যেকোনো বিদেশী এয়ারলাইনসকেও সেফটি সিকিউরিটি সনদ বাধ্যতামূলকভাবে বেবিচক থেকে নিতে হয়। এছাড়া এয়ার অ্যান্ড নেভিগেশন সার্ভিস, এয়ার ট্রাফিক সার্ভিস, কমিউনিকেশন অ্যান্ড নেভিগেশন সার্ভিস, অ্যারোনটিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস, মেটিওরোলজিক্যাল সার্ভিসও দেয় বেবিচক।

বিপুল কর্মযজ্ঞের বিপরীতে সংস্থাটিতে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব রয়েছে। এটিও এফএএর কাট্যাগরি-- থাকার অন্যতম কারণ। যদিও গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বিভাগে জনবল নিয়োগ দিয়েছে বেবিচক। নিয়োগের প্রক্রিয়ার রয়েছেন আরো অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

এদিকে, এফএএর ক্যাটাগরি- ছাড়পত্র না থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে গত ৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহন বিভাগের বিমান আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহকারী সচিব অ্যানি পেটসঙ্কের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রদূত মো. শহীদুল ইসলাম। এর আগে ২০২০ সালে ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। করোনা মহামারীর কারণে বেশ কয়েকবার পিছিয়েছে ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ। অবশেষে স্থবির হওয়া প্রক্রিয়া আবারো শুরু হয়েছে। লোকসানের মুখে ২০০৬ সালে ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

আরও