ভারতের কলকাতায় একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশীদের মধ্যে দুজন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার। তারা হলেন উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের আলিমুজ্জামান সাজু (৪৫) এবং তেঁতুলিয়া গ্রামের রেবতী সরকার (৩৬)। তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার কথা ছিল সাজু ও রেবতীর। অথচ এখন এখন তাদের দেশে ফেরার অপেক্ষায় তারা।
এর আগে গতকাল বুধবার রাতে সাজুর মৃত্যুর খবর পান তার পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসা শেষে ওই দিনই তার দেশে ফেরার কথা ছিল। এর আগেই প্রাণ হারানোর খবরে তাদের নিজ নিজ এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে দুই গ্রামের পরিবেশ।
আলিমুজ্জামান সাজু কালিগঞ্জের তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের মৃত ইউনুচ সরদারের ছেলে। পেশায় ঘের ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। চার ভাইয়ের মধ্যে ছিলেন সবার ছোট। তার মেজো ভাই রাজু সরদারও মারা গেছেন। মাত্র এক বছর আগে মাকে হারিয়েছেন সাজু।
বৃহস্পতিবার সকালে সাজুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী। বড় ভাই সাহেব আলী সরদার ও সেজো ভাই উজ্জ্বল সরদার বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
সাজুর নিকটাত্মীয় মোখলেছুর রহমান পল্টু বলেন, কোমরের ব্যথার চিকিৎসার জন্য প্রায় পাঁচ-ছয় দিন আগে ভারতে গিয়েছিলেন সাজু। চিকিৎসা শেষে বুধবার তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার আগেই হোটেলে আগুন লাগার খবর আসে।
তিনি বলেন, বুধবার রাত ১০টার দিকে জানতে পারি কলকাতার একটি হোটেলে আগুন লেগে সাজু মারা গেছে। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। পরে সেখানে থাকা এক স্বজনের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হই।
সাজুর বড় ভাই সাহেব আলী সরদার বলেন, ভাইয়ের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। হঠাৎ শুনলাম যে হোটেলে সে ছিল, সেখানে আগুন লেগেছে। পরে নিশ্চিত হই, আমার ভাই মারা গেছে। ভাইয়ের সেই ফেরাটা আর হলো না।
সাজুর বাড়ির কেয়ারটেকার ইসমাইল হোসেন বলেন, বাড়ির দ্বিতীয় তলার কাজের জন্য ইট আনা হয়েছে। যাওয়ার সময় সাজু বলেছিল, আমি ইন্ডিয়া থেকে আসি, ঘের-বেড়ি তুই দেখিস, আমি এসে কাজে হাত দেব। এর মধ্যেই দুর্ঘটনা হয়ে গেল। এখন আর কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
প্রতিবেশী হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, সাজু এলাকায় সৎ ও ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রায় সাত-আট বছর আগে তিনি হজ পালন করেন। পরে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন। কারো সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। মায়ের মৃত্যুর এক বছর পর ছোট ভাইকেও হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা।
এদিকে একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত রেবতী সরকারের বাড়ি কালিগঞ্জের তেঁতুলিয়া গ্রামে। তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর বাড়িটিতেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তবে পরিবারের সদস্যরা ভারতে অবস্থান করায় বৃহস্পতিবার বাড়িটি ছিল অনেকটাই নীরব।
রেবতীর স্বামী ভবেশ সরকার। তাদের ছেলে অনিক সরকার অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে এবং মেয়ে ত্রিশা সরকার ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। তারা বর্তমানে ভারতের উত্তরাখন্ডে অবস্থান করছেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
রেবতীর স্বজন তপন সরকার বলেন, রেবতী আমার বৌদি। গতকাল রাতে তার ছেলের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে হোটেলে আগুন লেগে বৌদি মারা গেছেন। দাদা বাংলাদেশে ছিলেন। এখন তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, তাদের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটি কীভাবে এই শোক সামলাবে, সেটাই এখন আমাদের চিন্তার বিষয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চিকিৎসার জন্য আপনজনদের ছেড়ে ভারতে গিয়েছিলেন সাজু ও রেবতী। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে তারা ঘরে ফিরবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা মুহুর্তেই বদলে গেছে শোক আর অপেক্ষায়।
নিহত সাজুর প্রতিবেশী নাজমুল হুদা বলেন, হোটেলে কীভাবে আগুন লাগল এবং সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা কেমন ছিল, তা তদন্ত করে প্রকৃত কারণ প্রকাশ করা উচিত। অব্যবস্থাপনার কারণে যেন আর কোনো পরিবারকে এভাবে আপনজন হারাতে না হয়।
স্থানীয় নলতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান বলেন, সাজুর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বণিক বার্তাকে জানান, কলকাতায় আবাসিক হোটেলে নিহত কালিগঞ্জের দুজনের মরদেহ দেশে আনার জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে।