কয়েক বছর ধরেই ঢাকা-টরন্টো রুটে সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়ে আসছে রাষ্ট্রায়ত্ত উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেড। যদিও করোনা মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে মাঝে ঝিমিয়ে পড়ে সব উদ্যোগ। তবে শেষ পর্যন্ত বিমান সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেভাবেই হোক ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসেই ঢাকা-টরন্টো রুটের প্রথম ফ্লাইটটি পরিচালনা করা হবে। এজন্য নেয়া হচ্ছে সব ধরনের প্রস্তুতিও। তবে কানাডা সিভিল এভিয়েশন জানিয়েছে, বোর্ডিং সিস্টেম অটোমেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ১২ সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। সে হিসেবে ধারাবাহিকভাবে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালাতে আগামী জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বিমানকে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কয়েক বছরই কানাডার টরন্টো হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে আকাশপথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে আসছিল বিমান। কিন্তু মহামারী করোনার কারণে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে অবশেষে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে সেই পরিকল্পনা। এরই মধ্যে টরন্টোতে ল্যান্ডিং অ্যান্ড ওভার ফ্লাইং পারমিশন, স্লট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমতি পেয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। বাকি রয়েছে স্থানীয় জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) নিয়োগ এবং টরন্টো বিমানবন্দরের বোর্ডিং সিস্টেম অটোমেশন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কানাডা সিভিল এভিয়েশন জানিয়েছে, বিমানের বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য বোর্ডিং সিস্টেম অটোমেশনের প্রক্রিয়া শেষ করতে কমপক্ষে ১২ সপ্তাহ সময় লাগবে। সেটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিমান বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে না। অন্যদিকে ২৬ মার্চ থেকে ঢাকা-টরন্টো রুটে ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত ওই রুটের টিকিট বিক্রি শুরু করেনি বিমান কর্তৃপক্ষ। বিমানের ওয়েবসাইটেও টিকিট বিক্রির সিস্টেমে দেয়া হয়নি টরন্টো রুটের তথ্য।
টরন্টো ফ্লাইটের অগ্রগতি প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, কানাডার টরন্টোতে ২৬ মার্চ বিমানের ফ্লাইট শুরু করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এ রুটের ফ্লাইট চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমগুলো অনেকটা চূড়ান্তও হয়েছে। বাকি আছে কেবল বোর্ডিং সিস্টেম অটোমেশনের প্রক্রিয়া। এটি সম্পন্ন করতে ১২ সপ্তাহ সময় প্রয়োজন বলে বিমান জানিয়েছে। যদিও ২৬ মার্চের ফ্লাইটটি শুরু করতে কোনো সমস্যা হবে না বলে এখনো আমরা আশাবাদী। কারণ ওই ফ্লাইটের জন্য কানাডীয় কর্তৃপক্ষের স্লট পাওয়া গেছে। ওই ফ্লাইটের পর নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়তো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। আর ফ্লাইট নিশ্চিত হলে যাত্রীদের কাছে টিকিটও বিক্রি শুরু করবে বিমান।
এ প্রসঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২৬ মার্চ টরন্টো রুটে বিমান যে ফ্লাইটটি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটি মূলত পরীক্ষামূলক। ওই ফ্লাইটের জন্য ককপিট এবং কেবিন ক্রুদের ভিসাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজও এখন শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে মূলত আগামী জুন থেকে। জুন থেকে টরন্টোর উদ্দেশে ফ্লাইটগুলো ঢাকা থেকে মধ্যরাতের পর ছেড়ে যাবে। বিরতিহীন প্রায় ১৫ ঘণ্টার এ ফ্লাইটটি পরদিন কানাডার সময় সকাল ১০টার দিকে টরন্টো পৌঁছবে। বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে কানাডার ফ্লাইট পরিচালনা করবে বিমান।
বিমানের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা-টরন্টো-ঢাকা রুটে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ইকোনমি ১ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার, প্রিমিয়াম ইকোনমি ২ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার, বিজনেস ক্লাস ৪ হাজার মার্কিন ডলার। আর ওয়ানওয়ের ভাড়া হবে ইকোনমি ১ হাজার মার্কিন ডলার, প্রিমিয়াম ইকোনমি ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার, বিজনেস ক্লাস ২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার।
জানা গেছে, কানাডায় জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) নিয়োগের জন্য গত মাসে দরপত্র আহ্বান করে বিমান কর্তৃপক্ষ। জিএসএ (যাত্রী) এবং জিএসএ (কার্গো) নিয়োগের জন্য দেয়া ওই দরপত্র জমা দেয়ার সময় শেষ হয় ৮ মার্চ। ফলে দরপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিতে আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে বিমানকে। এর আগেও জিএসএ নিয়োগে একাধিক দরপত্র আহ্বান করেছিল বিমান কর্তৃপক্ষ। তবে কোনোবারই কানাডার শীর্ষ কোম্পানিগুলো জিএসএ থেকে বিমানের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। ফলে বারবার দরপত্র আহ্বান করেও জিএসএ নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিমান।
কানাডায় বিমানের জিএসএ নিয়োগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, বিমান জিএসএ নিয়োগ দিতে দরপত্র দিয়েছে। সব প্রক্রিয়া মেনে জিএসএ নিয়োগও দেয়া হবে। তবে সেটি ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইটের ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। কারণ বিদেশী এয়ারলাইনসের জন্য বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনায় জিএসএ নিয়োগ বাধ্যতামূলক হলেও কানাডার ক্ষেত্রে বিদেশী এয়ারলাইনসের জন্য সে রকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ২১। এর মধ্যে ১৬টি নিজস্ব ও পাঁচটি লিজ নেয়া। নিজস্ব বাহনগুলোর মধ্যে বোয়িং-৭৭৭-৩০০ ইআর চারটি, বোয়িং-৭৮৭-৮ চারটি, বোয়িং-৭৮৭-৯ দুটি, বোয়িং-৭৩৭ দুটি ও ড্যাশ-৮ চারটি। অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটের মধ্যে লন্ডন, রিয়াদ, দাম্মাম, মদিনা, জেদ্দা, কুয়েত, দোহা, আবুধাবি, দুবাই, মাসকট, নয়াদিল্লি, কলকাতা, কাঠমান্ডু, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুরে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান।