পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনোভাবেই থামছে না পাহাড় কাটা। গোপনে-প্রকাশ্যে নির্বিচারে পাহাড় কেটে পরিবেশে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে পাহাড় কাটায় জড়িয়ে পড়ছেন জনপ্রতিনিধিরাও। এবার রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান উমেচিং মারমার বিরুদ্ধে পাহাড় কেটে ঝিরি ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। অথচ বিষয়টি জানে না উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের শীলছড়িতে নারী ভাইস চেয়ারম্যানের নিজ বসতঘরের পাশেই অবাধে পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড় কাটা মাটির বেশির ভাগ অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হলেও কিছু অংশ শীলছড়ি ঝিরির পাশঘেঁষে ফেলা হচ্ছে। ঝিরি ভরাট করে বেদখলে নেয়ার উদ্দেশ্যেই মাটি ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বরইছড়ি-কাপ্তাই নতুনবাজার সড়কের পাশেই শীলছড়ি ক্লাবের পাশঘেঁষে একটি গ্রামীণ কাঁচা সড়ক। এ সড়কে প্রবেশের ডান পাশেই পাহাড়ি ঝিরির পাশে মাটি ফেলা হয়েছে। এ সড়ক ধরে ৫০০ মিটার এগোলে দেখা মেলে পাহাড় কাটার দৃশ্য। উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান উমেচিং মারমার বাড়ির পাশের পাহাড়টির অর্ধেকের বেশি অংশ কাটা হয়ে গেছে। খাড়াভাবে কাটা পাহাড়ের বুকে রয়ে গেছে এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কাটার চিহ্ন। ঘটনাস্থলে এ প্রতিবেদকের উপস্থিতির কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে এক্সক্যাভেটরটি সরিয়ে রাখা হয়। পাহাড়ের মাটি কাটার শুরুর দিকে একটি বুলডোজার থাকলেও সেটি ঘটনাস্থলে গিয়ে পাওয়া যায়নি।
পাহাড় কাটার ছবি তোলার সময় এগিয়ে আসেন উমেচিং মারমার মেয়ের জামাই মংচাই মারমা। মংচাই মারমা জানান, পাহাড় কাটার স্থানে ঘরবাড়ি করার উদ্দেশ্যে তারা পাহাড়টি কাটছেন। যেটুকু কাটা হয়েছে এরপর আর তারা পাহাড় কাটবেন না। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মূলত ঘরবাড়ি নির্মাণের উদ্দেশ্যে পাহাড় কাটার কথা বলা হলেও পাহাড়ের মাটি ফেলা হচ্ছে ঝিরির পাশের ঢালু অংশে। এতে করে ঝিরিটি সংকুচিত করে ভরাটের পর বেদখলের চেষ্টা চলছে।
জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অবৈধভাবে ঝিরি ভরাট করছেন উমেচিং মারমা। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় শীলছড়ি ঝিরি থেকে পাথর উত্তোলনের ফলে ঝিরির অবস্থাও মৃতপ্রায়। শুষ্ক মৌসুমের ঝিরিতে পানি থাকে না।
এদিকে শীলছড়ি ঝিরির পাশেই অবস্থিত শীলছড়ি ক্লাবে মঙ্গলবার দুপুরে ওএমএসের চাল বিক্রয় কার্যক্রম পরিদর্শনে আসেন কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনতাসির জাহান। এ সময় তার সঙ্গে রাঙ্গামাটির সাবেক জেলা প্রশাসক ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব একেএম মামুনুর রশিদসহ অন্য কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এসেছেন। ক্লাবের পাশে পাহাড় কাটার মাটি দিয়ে ঝিরি ভরাটের কাজ চললেও বিষয়টি জানেন না বলে জানান ইউএনও।
কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান উমেচিং মারমা দলীয়ভাবে উপজেলা আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক। এর আগে তিনি একাধিকবার উপজেলার ৫ নম্বর ওয়াগ্গা ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান উমেচিং মারমা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় প্রশাসন জেনেও নীরব ভূমিকা নিয়েছে। পাহাড়ের পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, কখনো উন্নয়নের নামে, কখনো প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিদের পাহাড় কাটা থামানো না গেলে পাহাড়ে পরিবেশের আরো বিপর্যয় ঘটবে। অবিলম্বে প্রশাসনকে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রমে প্রতিরোধ কার্যক্রমে উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
পাহাড় কাটা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান উমেচিং মারমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার মেয়ের জামাই ঘর করার জন্য উঁচুনিচু ঢিলা সমান করেছেন। ওইভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে না। আর মাটিগুলো আমাদের বাগানে ও পরিত্যক্ত জায়গায় ফেলা হচ্ছে।’
ঝিরি ভরাট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাটি যখন ফেলা হয়েছে তখন আমি ছিলাম না, ঝিরির পাশে যে মাটি ফেলা হয়েছে সেগুলো টেনে তোলা হচ্ছে।’
ইউএনও মুনতাসির জাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রশাসন কাউকে মাটি কিংবা পাহাড় কাটার অনুমতি দেয় না। উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যানের পাহাড় কাটার খবরটি আমাদের জানা নেই।’ ঝিরির পাশে মাটি ভরাটের বিষয়টি দেখেছেন কিনা জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে স্যাররা এসেছেন, তাদের নিয়ে চাল বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়েছি। অন্যদিকে খেয়াল করিনি, তাই বিষয়টি চোখে পড়েনি।’