দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাড্ডা এমসিএইচসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, লুটপাট ও দখলের মতো একের পর এক ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরই প্রতিফলন।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি হামলা, লুটপাট, ভাংচুরের ঘটনা দেশজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনা ঠেকাতে পুলিশ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। গত কয়েক দিনে ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেয়া, ইসিবিতে একটি স্টুডিওতে হামলা-ভাংচুর, মোহাম্মদপুরের আদাবর, চাঁদ উদ্যানসহ বিভিন্ন স্থানে ঘটা বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে অনেক জায়গায় স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিক সমাজে উদ্বেগ বাড়ছে। হামলার সঙ্গে যুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর ভোরে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাটের পর স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির কয়েকটি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের উপস্থিতিতেই লুটপাট চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ভবন ভাঙা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেফতার এবং দুই ট্রাক মালপত্র উদ্ধারের কথা জানিয়েছে ডিএমপি। প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, লুটপাটের সময় ঘটনাস্থলের বাইরে পুলিশের গাড়ি ছিল। অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি দায়িত্ব পালনে পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা। এরই মধ্যে শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাড্ডা এমসিএইচসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, লুটপাট ও দখলের মতো একের পর এক ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরই প্রতিফলন। এ ধরনের ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দলীয় পরিচয় কোনোভাবেই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। এসব ঘটনা অব্যাহত থাকলে শুধু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নয়, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জরুরি ভিত্তিতে জড়িতদের নিরপেক্ষভাবে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

যেসব ঘটনায় জমি বা স্থাপনার দখলকে কেন্দ্র করে সংঘাতের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে। জমি বা ব্যবসায়িক বিরোধের আড়ালে সংঘবদ্ধ হামলা, লুটপাট ও দখলের প্রবণতা তৈরি হলে তা শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের নিরাপত্তাকেই ঝুঁকিতে ফেলবে না, বরং সরকারের আইন প্রয়োগের সক্ষমতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় পৃথক মামলা ও তদন্তের পাশাপাশি এসব ঘটনায় অভিন্ন কোনো প্যাটার্ন আছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) রাড্ডা ও ইসিবির ঘটনা ছাড়াও দেশের অন্যান্য দখল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে অর্ধশত বছর ধরে গরিব অসহায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ক্ষমতাসীন দল কোন ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে? রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক নির্বাচনের জনরায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের নেতাকর্মীদের এ-জাতীয় কর্মকাণ্ড দেশবাসীর কাছে কী বার্তা দিচ্ছে? সাধারণ জনগণের মানসপটে বিগত সময়ের কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারী আচরণ এখনো সতেজ। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা দলীয় নেতাকর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশের চলমান দখলবাজি ও চাঁদাবাজির পরিণতি ভেবে দেখছেন কি! রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তৃণমূলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দলটির অনেক নেতাকর্মী বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন; যা গণমাধ্যম, পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।’

মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলার একদিন পরই ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ আশপাশের স্থাপনায় হামলার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ বলছে, জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে বিবাদের জেরে ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানেও একই সময়ে জমি ও ভবন দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল ব্যক্তি সেখানে গিয়ে স্থাপনায় হামলা চালায়। ঘটনাটি নিয়ে থানায় অভিযোগও দেয়া হয়েছে।

গুঁড়িয়ে দেয়া রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ভবন ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত সাত মাসে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছিল, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় তা কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল যে তারা আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা কমিয়ে একটি স্বস্তির পরিবেশ নিশ্চিত করবে। সরকার যে সে চেষ্টা করছে না, তা বলা যাবে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। অর্থের বিনিময়ে পরিকল্পিতভাবে অপরাধ সংঘটিত বা উসকে দেয়া হচ্ছে কিনা, সরকারকে সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।’

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ—দুটিই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে দৃশ্যমান পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব ঘটনা ঘটছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও লুটপাট, ইসিবিতে আবাসন প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাংচুর, মোহাম্মদপুরের আদাবর, চাঁদ উদ্যানসহ বিভিন্ন ঘটনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’

সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়লে তা অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও ক্ষতিকর বলে মনে করেন বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘তরুণপ্রধান দেশে বিপুল পরিমাণ তরুণ জনগোষ্ঠী বেকার। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি। সব মিলিয়ে কিন্তু অনেকের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা তৈরি হয়েছে। সেখানে যদি কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ না হয় তাহলে মানুষের অপরাধপ্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এটা কিন্তু অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। কারণ অর্থনীতির অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদন হচ্ছে নিরাপদে নির্ঝঞ্ঝাটে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারা।’

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা এখনো সীমিত—দেড় হাজার মানুষের জন্য একজনের কম পুলিশ রয়েছে। ফলে বড় ধরনের কোনো ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে জড়ো হলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় চ্যালেঞ্জ থাকবেই। এ কারণে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের হামলা ও লুটপাটের আগে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে চলে আসে। এক্ষেত্রে সীমিতসংখ্যক পুলিশ সদস্য দিয়ে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। পুলিশের সক্ষমতার মধ্যে থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের আগে তা প্রতিরোধ এবং পরে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা—দুই প্রক্রিয়াতেই পুলিশ কাজ করছে। একই সঙ্গে অপরাধে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাকে পুলিশ কোনো ধরনের সুরক্ষা দিচ্ছে না। রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয় না। তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

আরও