মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউরোপের কয়েকটি রিফাইনারিতে নির্ধারিত তেল সরবরাহ বাতিল হয়েছে। একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। তবে এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য এখনই সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখছে না জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং পরিবহন রুটের ঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ে বড় চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি সৌদি আরবের বৃহৎ জ্বালানি তেলের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউরোপের তেল পরিশোধনাগারগুলোতে তেল রফতানি বন্ধ ঘোষণা করেছে। ইউরোপের রিফাইনারিগুলোর জন্য সেপ্টেম্বরে সরবরাহের শিডিউল থাকা বেশকিছু কার্গো এরই মধ্যে বাতিল করা হয়েছে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় ফিউচার মার্কেটে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের বেশিতে ওঠানামা করছে। পরিস্থিতি আরো অবনতি হলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট এশিয়ার বাজারেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণের পূর্বাভাস দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো।
ইউরোপের বাজারে তেল রফতানি স্থগিত কিংবা কার্গো সরবরাহ বাতিল করলেও বাংলাদেশ সরবরাহ বন্ধ-সংক্রান্ত কোনো বার্তা নেই বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। বরং অপরিশোধিত জ্বালানি যে পরিমাণ আমদানি করা হয়েছে তা দিয়ে আগামী চার মাস কোনো অসুবিধা হবে না বলে জানিয়েছেন তারা।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সৌদি জ্বালানি সংকটে আমাদের আমদানি বন্ধ-সংক্রান্ত কোনো বার্তা নেই। আমরা জ্বালানি তেলের বড় অংশ এ অঞ্চল অর্থাৎ চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে সংগ্রহ করি। সৌদি থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি করি। এখন পর্যন্ত দুটো জাহাজ আমাদের স্টক রয়েছে, যা দিয়ে আগামী চার মাস ক্রুডের কোনো সমস্যা হবে না। এদিক থেকে আমরা নিশ্চিত রয়েছি।’
সৌদি আরবের তেল সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে হুমকি, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে তা জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক হারে বাড়িয়ে তুলতে পারে। এতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
এরই মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বিকল্প উৎস খুঁজছে বিপিসি। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনাও করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের উপযোগী চারটি দেশের অপরিশোধিত তেল চিহ্নিত করেছে বিপিসি। নাইজেরিয়ার ‘বনি ক্রুড’, মালয়েশিয়ার ‘মালয়েশিয়ান ব্লেন্ড’, নরওয়ের ‘আলভহেইম ব্লেন্ড’ এবং আলজেরিয়ার অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা হয়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, বিদ্যমান শোধনাগার সুবিধা ব্যবহার করেই এসব অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা সম্ভব। গত এপ্রিলে ইস্টার্ন রিফাইনারি নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন বিপিসির কাছে জমা দেয়।
দেশে প্রতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। যার মধ্যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় ১৪-১৫ লাখ টন। দুটি দেশ থেকে এ তেল আমদানি করা হয়, যার মধ্যে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মারবান ক্রুড’। এ দুই ধরনের অপরিশোধিত তেল থেকে ডিজেল, বিটুমিন ও পেট্রলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য তৈরি হয় দেশের রিফাইনারিতে।
বিপিসির নতুন চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি হবে না। সেই সঙ্গে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বিকল্প উৎসগুলোর সঙ্গে বিপিসি এরই মধ্যে আলোচনা শুরু করেছে।’