সিরাজগঞ্জে দেশের তৃতীয় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র

চালু হয়নি সাত বছরেও পড়ে আছে অবকাঠামো

নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে সিরাজগঞ্জে ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয় দেশের তৃতীয় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের।

নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে সিরাজগঞ্জে ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয় দেশের তৃতীয় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রকল্পটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে, বাতাসের গুণমান উন্নয়নে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমাতে সহায়ক। লক্ষ্য ছিল দুই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার। তবে শুধু টাওয়ার বসানোর পর আর কোনো কাজ হয়নি। সাত বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে ৪৩ কোটি টাকার অবকাঠামো।

কেন্দ্রটি কবে নাগাদ চালু হবে বা বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে সংশ্লিষ্টরা সে বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না। আদৌ চালু হবে কিনা সে বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারছেন না। প্রকল্পের আটটি টাওয়ার এমনিতেই রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। অচল টারবাইনের পাখাগুলো যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জ শহরের মালশাপাড়া এলাকার যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির। বসানো হয় আটটি টারবাইনযুক্ত (পাখা) টাওয়ার। এজন্য ব্যয় ধরা হয় ৪২ কোটি টাকা। তবে টাওয়ার বসানোর পর কার্যত প্রকল্পের আর কোনো কাজ হয়নি। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তত্ত্বাবধানে এবং প্যান এশিয়া পাওয়ার সার্ভিস লিমিটেডের বাস্তবায়নে শুরু হওয়া প্রকল্পটি এখন পর্যন্ত উৎপাদনে যেতে পারেনি। এমনকি হস্তান্তরও করা হয়নি।

তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তিন মাস হলো উৎপাদনে গেছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। যদিও এর অনুকূলে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি তারা। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হস্তান্তর করা হয়নি, তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যান এশিয়া পাওয়ার সার্ভিস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী প্রকৌশলী ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ে স্থাপন করা টাওয়ারের উচ্চতা কম হয়েছিল। কভিড মহামারী, ভূমি জটিলতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যায়নি। প্রকল্পও চালু হতে সময় লেগেছে।’

তিনি দাবি করেন তিন মাস আগ থেকে উৎপাদনে গেছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। প্রতিদিন কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে বা উৎপাদন হলে তা সরবরাহের নমুনা কী—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এছাড়া হস্তান্তর করা না হলে কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এবং কারা এটার দেখভাল করছেন—এমন প্রশ্নের উত্তরও তিনি এড়িয়ে যান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ ও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করা হয়েছে। এজন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমিন সরকার বলেন, ‘ঘটা করে প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয়। অথচ দীর্ঘ সাত বছরেও কাজ শেষ হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। মূলত সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করতেই এখানে এমন প্রকল্প নেয়া হয়েছিল।’

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি অপরিকল্পিত বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। কেননা পর্যাপ্ত বায়ু প্রভাবের ওপর নির্ভর করে এ ধরনের প্রকল্প নেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে সেটা করা হয়নি। কখনো টারবাইনের পাখাগুলো ঘুরতে দেখিনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি। মানুষ এর কোনো সুবিধা পায়নি।’

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উৎপাদনবিষয়ক কর্মকর্তা মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘সিরাজগঞ্জের বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। কেন্দ্রটি চালু হয়েছে কিনা, প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটুকু হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারব না।’

আরও