ভারি বর্ষণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা হারিয়েছে ঢাকা

সংরক্ষিত হয়নি ঢাকার ৫ ওয়াটার রিটেনশন পন্ড

গতকাল সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর আগের ২৪ ঘণ্টায়ও ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল।

দুইদিনের অতিভারি বর্ষণে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও স্থানে পানি জমে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারি ও অতিভারি বর্ষণে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা হারিয়েছে কংক্রিটের নগরী। জলাবদ্ধতা নিরসনে কৌশলগত পরিকল্পনায় থাকা রাজধানীর পাঁচটি স্থায়ী জলাধার বা ওয়াটার রিটেনশন পন্ডও সংরক্ষিত হয়নি। অনেক জায়গায় সংরক্ষণের আগেই গত আড়াই দশকে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়ে গেছে। ফলে সামনের দিনগুলোয় ঢাকায় জলাবদ্ধতা আরো তীব্র রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

গতকালের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে জুরাইন, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, লালবাগ, পলাশী, আজিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক, অলিগলি। সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, জলাবদ্ধতায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। গুলশান, ধানমন্ডি, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায়ই ছিল হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। গুলশানে সড়কের ফুটপাত থেকে পানির স্রোত লেকে ভেসে যেতে দেখা গেছে। মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন গুলশান লেকের পাড়ে ফুটপাত ভেঙে পানির স্রোত লেকে বইতে দেখা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কোথাও কোথাও কোমর থেকে হাঁটুসমান পানি জমেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠসহ অনেক হল এলাকা পানিতে ডুবে যায়। মতিঝিল ও আরামবাগ এলাকায়ও কোমর পর্যন্ত ভিজে রাস্তায় চলাচল করতে দেখা যায় পথচারীদের।

রাজধানীর এমন জলাবদ্ধতার ব্যাপারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকায় বৃষ্টিপাত হয় এমন দিনের সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু একদিনে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। বর্ষায় রাজধানীতে এমন ভারি ও অতিভারি বর্ষণ হলে সে পানি নিষ্কাশনের কোনো সহজ সমাধান দুই সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজধানীতে ভারি বর্ষণ হলে বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে পানি নামতে সময় লাগছে। বিশেষ করে যে স্রোতে পানি নামার কথা তার নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেক জায়গাতেই নেই। আবার বৃষ্টির পানি কোথাও জমা হবে, কোথাও ভূগর্ভস্থ লেয়ারে চলে যাবে এমন সলিড মাটির পরিমাণও কমে এসেছে। ফলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন করে পরিকল্পনা করছি। আমরা নতুন রিটেনশন পয়েন্ট, আউটলেট পয়েন্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণের কথা ভাবছি।’

ক্রমাগত খোলা জায়গা, সবুজ ও জলাশয় কমার কারণে ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আগামী দিনে আরো জটিল আকার ধারণ করবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনবিদরা। তাদের ভাষ্যে, শুধু বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সংযোগপথই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং ভারি বৃষ্টি হলে সে পানি কোথায় গিয়ে জমা হবে সেজন্য স্থায়ী জলাধারও প্রয়োজন। ঢাকায় এমন পাঁচটি স্থায়ী জলাধার বা রিটেনশন পন্ড চিহ্নিত থাকার পরও সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে গত আড়াই দশকে এ রিটেনশন পন্ডগুলোর নির্ধারিত স্থানে অনেক স্থাপনা নির্মিত হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকাকে বাঁচানোর জন্য যে কয়টি জরুরি উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো রিটেনশন পন্ডগুলো পুনরুদ্ধার করা। এগুলো শুধু বৃষ্টির পানিই ধারণ করবে না, বরং তাপ শোষণ, ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ, জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ আরো অনেক কাজ করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এগুলো দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে।’

জানা যায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ণয়ের জন্য ১৯৯৫ সালে ২০ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত পরিকল্পনা করেছিল রাজউক। পরিকল্পনাটির নাম ছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি ১৯৯৫-২০১৫)। সে পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের ঢাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে পাঁচটি রিটেনশন পন্ড বা স্থায়ী জলাধার প্রয়োজন। কোন কোন এলাকায় জলাধারগুলো হবে তা চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছিল।

পরে রাজউক ডিএমডিপি প্ল্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১০ সালে রাজধানীর জন্য একটি বিশদ আঞ্চলিক পরিকল্পনা বা ড্যাপ প্রণয়ন করে। সে বিশদ পরিকল্পনায় কল্যাণপুর, গোড়ান চটবাড়ি, নাসিরাবাদ, বেরাইদ ও উত্তরখানে বৃহৎ এলাকাজুড়ে (২০০ থেকে ৫০০ একরের বেশি বা কাছাকাছি আয়তনের) স্থায়ী জলাধার বা রিটেনশন পন্ড সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়। এসব রিটেনশন পন্ডের উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর বৃষ্টির পানির আধার তৈরি করা এবং ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ। বর্তমান ড্যাপ ও ঢাকা ওয়াসা ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানেও এ এলাকাগুলো স্থায়ী জলাধার হিসেবেই চিহ্নিত করা আছে।

রাজধানী ঢাকার নদী, খাল, লেক ও অন্যান্য গণপরিসরের মতো স্থায়ী জলাধার হিসেবে চিহ্নিত এসব এলাকাও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে বেদখল হয়ে পড়েছে। কল্যাণপুরে স্থায়ী জলাধারের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেছিল সরকার। তবে সেখানেও রিটেনশন পন্ড হিসেবে যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন, বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী জলাধার সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেয়ায় ঢাকা আগামী দিনে জলাবদ্ধতা এবং তীব্র জল সংকটের নগরীতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজধানী ঢাকা ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। বৃষ্টির দিনে সড়ক ও এলাকা—সবকিছু জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য একক কোনো সমাধান নেই। একদিকে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে পানিধারণের উৎসগুলোও বাড়াতে হবে। এজন্য ডিএমডিপিতে উল্লেখিত ওয়াটার রিটেনশন পন্ডগুলো দ্রুত সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।’

আড়াই দশক আগে পাঁচটি স্থায়ী জলাধারের সুপারিশ করা হলেও বর্তমানে সে এলাকাগুলো আর আগের মতো জলাধার রূপে নেই বলে রাজউকের একটি সূত্র জানিয়েছে। রাজউক পাঁচটি এলাকা নির্ধারণ করেছে। পরবর্তী সময়ে সরকারিভাবে বা খোদ রাজউকেরই উচিত ছিল এ পন্ডগুলো অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করার। কিন্তু কল্যাণপুর ছাড়া আর কোনো পন্ড সরকার অধিগ্রহণ করেনি।

গাবতলীর গৈদারটেকের বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত কল্যাণপুরের রিটেনশন পন্ড বা জলাধার। মূলত মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর ১, ধানমন্ডি এলাকার বৃষ্টির পানি জমা হয় এ জলাধারে। পরে সেই পানি পাম্পের মাধ্যমে অপসারণ করা হয় নদীতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কল্যাণপুর ওয়াটার রিটেনশন পন্ড হিসেবে ৫৩ একর জমি ২০০৬ সালে অধিগ্রহণ করে ঢাকা ওয়াসা। তবে গত দুই দশকে এখানেও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

রাজধানীর আরেকটি ওয়াটার রিটেনশন পন্ড হওয়ার কথা গোড়ান চটবাড়ি এলাকায়। তবে এখানে এরই মধ্যে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য প্রায় ৫০ একর জমি আবাসনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এটিসহ নাসিরাবাদ ও উত্তরখানের রিটেনশন পন্ড এখনো পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাসংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক দশক ধরেই পন্ড-সংশ্লিষ্ট এলাকায় জমির দাম বেড়ে চলেছে এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এসব এলাকায় নতুন সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এখানে জমির চাহিদাও বেড়েছে। ফলে যত দিন যাবে পন্ডের জন্য জমি অধিগ্রহণ আরো ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়বে।

রাজধানীর ওয়াটার রিটেনশন পন্ডসহ জলাধার সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সেফটি অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (এসএএফ) সহসভাপতি স্থপতি ইকবাল হাবিব। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে এ জলাধারগুলো বেদখল হয়ে গেল। আমরা বারবার সরকারকে বলেছি, আন্দোলন করেছি, এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বুঝিয়েছি, কিন্তু আমাদের কথা কেউ কানে তোলেনি। সরকার নিজের অধিগ্রহণ করা রিটেনশন পন্ডটিও বাঁচাতে পারল না। এর চেয়ে কষ্টের কিছু নেই।’

আরও