পরিবেশ অধিদপ্তরের দুর্বল এনফোর্সমেন্টে বাড়ছে দূষণ

পরিবেশ দূষণ রোধে দূষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ ধার্যের আইন রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ ক্ষতিপূরণ ধার্য করে থাকে। তবে দুর্বল এনফোর্সমেন্ট ও আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যাচ্ছে দূষণকারী। দূষণকারীদের বড় অংশই পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট আওতার বাইরে। যাদের এনফোর্সমেন্ট করে ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হচ্ছে, তারাও

পরিবেশ দূষণ রোধে দূষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ ধার্যের আইন রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ ক্ষতিপূরণ ধার্য করে থাকে। তবে দুর্বল এনফোর্সমেন্ট ও আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যাচ্ছে দূষণকারী। দূষণকারীদের বড় অংশই পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট আওতার বাইরে। যাদের এনফোর্সমেন্ট করে ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হচ্ছে, তারাও যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংস্থাটি ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৫৩০টি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছে। এ সময়ের মধ্যে ধার্যকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ২৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ধার্যকৃত ক্ষতিপূরণের অর্ধেকই আদায় করতে পারেনি সংস্থাটি!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্বল এনফোর্সমেন্ট ও আপিলের সুযোগ নিয়ে দূষণকারীরা আরো বেশি দূষণে উৎসাহিত হচ্ছে। এজন্য অবশ্যই পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করছেন তারা। 

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্টের পরিচালক মোহাম্মাদ মাসুদ হাসান পাটোয়ারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ ধার্যের একটি নীতিমালা আছে। এর বেশি বা কম ধার্যের সুযোগ নেই। আবার আপিল করাটাও আইনসম্মত বিষয়। আইন মেনেই এনফোর্সমেন্ট বিভাগ তার কাজ করে যাচ্ছে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৭১টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৩৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করে আদায় হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ১৫৭টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৫১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করে আদায় হয় ১৫ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ক্ষতিপূরণের অর্ধেকও আদায় করতে পারছে না সংস্থাটি। মূলত দূষণকারীরা মন্ত্রণালয়ে আপিল করে ক্ষতিপূরণের অর্থ কমিয়ে ফেলে। 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা শুধু পরিবেশ অধিদপ্তর নয়, বরং আমি মনে করি পরিবেশ মন্ত্রণালয়েরও দুর্বলতা। বাংলাদেশে যে পরিমাণ পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে এর বিপরীতে ক্ষতিপূরণ ধার্য অনেক বেশি হওয়ার কথা। অন্তত বাংলাদেশের বাজেটের সমপরিমাণ অংক তো হবেই। কিন্তু সেটা হয়েছে এক যুগে ৫০০ কোটি টাকার বেশি মাত্র। তা-ও অর্ধেকই আদায় হয়নি। এগুলো আবার মন্ত্রণালয় থেকে আড়ালে-আবডালেই কমিয়ে ফেলে। পরিবেশ দূষণকারীরা ক্ষতিপূরণ ধার্যের পর আপিল করে সেটা একেবারে নামমাত্র অংকে নিয়ে আসে। আমরা একটা আবাসন কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করলে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। পরে আপিল করে সেটা মাত্র ৫ লাখ টাকায় নিয়ে আসা হয়। তার মানে পরিবেশ দূষণ রোধে মন্ত্রণালয়ের কোনো সদিচ্ছা আছে বলে মনে হয় না। সরকার আমাদের শুধু উন্নয়নের গল্প বলে, পরিবেশের কোনো কথা তো আমরা শুনি না। তাই পরিবেশের উন্নতির জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবার আগে প্রয়োজন।’ 

দেশের পরিবেশ দূষণ ধ্বংসাত্মক আকার ধারণের পেছনে পরিবেশ অধিদপ্তরের দুর্বল এনফোর্সমেন্ট দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ এজাজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বিদ্যমান পরিবেশ দূষণের পেছনে অবশ্যই দুর্বল এনফোর্সমেন্ট দায়ী। পরিবেশ অধিদপ্তর এনফোর্সমেন্ট করে কম, ধার্যকৃত ক্ষতিপূরণও আদায় করতে ব্যর্থ। দূষণকারীদের আপিলের সুযোগটি রাখার ফলেই এ রকম হচ্ছে। তাই আমরা মনে করি, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পরিবেশ দূষণ করেছে প্রমাণিত হয়, জরিমানা করার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর আগে এটা করত। কিন্তু ইদানীং তারা এটা করছে না। ফলে দূষণকারী আপিল করে আবার দূষণ করতে থাকে। এ দুর্বল প্র্যাকটিস থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের বেরিয়ে আসতে হবে।’

আরও