২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দ ও আওতা বাড়ানো চ্যালেঞ্জ

নভেল করোনাভাইরাসের অভিঘাতে দেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে সাড়ে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। দেশে সরকারের হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ অতিক্রম করেছে, যদিও বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলো মনে করে, মূল্যস্ফীতির

নভেল করোনাভাইরাসের অভিঘাতে দেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে সাড়ে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। দেশে সরকারের হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ অতিক্রম করেছে, যদিও বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলো মনে করে, মূল্যস্ফীতির হার কমপক্ষে ১২ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে দরিদ্র জনগণের সুরক্ষায় আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বরাদ্দ অন্তত গত বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হবে বলে মনে করছিলেন অর্থনীতিবিদরা।

কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় অনিশ্চিত হওয়ায় এ খাতে বরাদ্দ সেভাবে বাড়ছে না। এ খাতে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ২৩ ও জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের চেয়ে মাত্র ২ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা অর্থাৎ মাত্র ২ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ৮৩ ও জিডিপির ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। গত অর্থবছরের চেয়ে চলতি বাজেটে ১২ হাজার ৪০ কোটি টাকা অর্থাৎ ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, প্রতিবন্ধী ভাতা ছাড়া আর কোনো ভাতা বৃদ্ধিরও প্রস্তাব করা হচ্ছে না। প্রতিবন্ধী ভাতাও বাড়ছে সাকল্যে ১০০ টাকা। বর্তমানে প্রতিবন্ধীরা মাসে ভাতা পান ৭৫০ টাকা। আগামী বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। অন্য সব ভাতার হার অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। এমনকি সামাজিক নিরাপত্তা খাতের উপকারভোগীর সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে না।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ছাড়াও বয়স্ক ভাতা, স্বামী নিগৃহীতা, বিধবা, দরিদ্র মায়ের মাতৃত্বকালীন ভাতা, শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সম্মানী ভাতা, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ভাতা রয়েছে। এদের কারো ক্ষেত্রেই নতুন বাজেটে ভাতা বাড়ছে না। তিন অর্থবছর ধরে এসব উপকারভোগী মাসে ৫০০ টাকা হারে ভাতা পাচ্ছেন। আগামী অর্থবছরেও একই পরিমাণ ভাতা দেয়া হবে।

অর্থ বিভাগের বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজন থাকলেও এ খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া যাচ্ছে না। কারণ বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আগামী অর্থবছরে অর্থ প্রাপ্তিতে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তাই বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ কমিয়ে আনা হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, দেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতের আওতায় ১২৩টি কর্মসূচি বা বিষয় রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এগুলোর মধ্যে আটটি কর্মসূচি হচ্ছে নগদ ভাতা আর ১১টি খাদ্যসহায়তা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে লাগামহীনভাবে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। তাই সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো সম্ভব না হলেও যেসব উপকারভোগী অনেক দিন থেকে মাত্র ৫০০ টাকা করে পাচ্ছেন, আগামী বাজেটে তাদের অন্তত ১ হাজার টাকা করে দেয়া উচিত। এজন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য রাজস্ব আয়বৃদ্ধির বিষয়টিতে জোর দিতে বলেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বণিক বার্তাকে বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় এ খাতে বরাদ্দ না বাড়ানোটা সামাজিক অন্যায়। হয় সরকারের অর্থ নেই অথবা বরাদ্দের ক্ষেত্রে তাদের মনোভাবের সমস্যা রয়েছে। সমপর্যায়ের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ সর্বাপেক্ষা কম। মাথাপিছু জাতীয় আয় বাড়ছে, উপকারভোগীরা মাসে মাত্র ৫০০ টাকা করেই পাবেন এটা ঠিক নয়।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে সারা বিশ্বই খারাপ সময় পার করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এ ধরনের সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। কিন্তু সরকারের বাজেটের অবস্থাও খারাপ। ভর্তুকির চাপ অনেক বেড়ে গেছে, কিন্তু রাজস্ব আয় বাড়েনি। তাই এ দুটো ব্যালান্স করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে গিয়েছে। আগামীতে আরো কিছু পণ্যের দাম বাড়বে বলে শোনা যাচ্ছে। ফলে গরিব মানুষের জীবন-জীবিকা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমরা চাই এ খাতে আরো বেশি বরাদ্দ বড়ানো হোক।

আরও