কলকারখানা চালুর পর বাড়ছে দূষণ

পুরনো রূপে ফিরছে ঢাকার ৫ নদ-নদী

করোনা সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটি চলাকালে বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল কলকারখানা। ফলে নদীতে পড়েনি কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য। সেই সঙ্গে নৌযান চলাচলও বন্ধ থাকায় কমে আসে দূষণ, প্রাণ ফিরে পায় নদী। এ সময় ঢাকার বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদের পানির মান দ্বিগুণেরও বেশি উন্নত হয়েছিল। কিন্তু এ সুসময় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ছুটি শেষে শিল্প-কারখানা চালু হওয়ার পর পরই নদীর ওপর সেই পুরনো অত্যাচার ফিরে এসেছে। আগের মতোই কারখানার দূষিত বর্জ্য মিশছে নদীতে।

করোনা সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটি চলাকালে বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল কলকারখানা। ফলে নদীতে পড়েনি কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য। সেই সঙ্গে নৌযান চলাচলও বন্ধ থাকায় কমে আসে দূষণ, প্রাণ ফিরে পায় নদী। এ সময় ঢাকার বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদের পানির মান দ্বিগুণেরও বেশি উন্নত হয়েছিল। কিন্তু এ সুসময় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ছুটি শেষে শিল্প-কারখানা চালু হওয়ার পর পরই নদীর ওপর সেই পুরনো অত্যাচার ফিরে এসেছে। আগের মতোই কারখানার দূষিত বর্জ্য মিশছে নদীতে।

নদী দূষণ ও নদীর পানির মান পরীক্ষা করতে প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সংস্থাটি বলছে, সাধারণত নদীর পানি দূষণ শুরু হয় নভেম্বরে। প্রতিদিনই বাড়তে থাকে এ দূষণ। এপ্রিলে দূষণ চরম অবস্থায় পৌঁছে। গত তিন বছরে দূষণের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। তবে সাধারণ ছুটির প্রভাবে চলতি বছর এপ্রিলে রাজধানীকে ঘিরে রাখা পাঁচটি নদ-নদীর পানির মান বেশ উন্নতির দিকে ছিল। গত দুই মাসে আবার এ মান অবনতির দিকে যাচ্ছে।

পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মান নিরূপণ করে নদী দূষণ ও পানির মান যাচাই করা হয়। এক লিটার পানিতে ৫ মিলিগ্রাম ডিও থাকলে পানির মান ভালো বলে ধরা হয়। এছাড়া বিওডি (জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা) এবং সিওডি (অজৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা) পদ্ধতিতে পানির মান যাচাই করা যায়। পানিতে বিওডি ও সিওডির পরিমাণ বেড়ে গেলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। এ দুইয়ের পরিমাণ কমে গেলে পানি দূষণের মাত্রা কম বলে ধরে নেয়া হয়। অর্থাৎ দ্রবীভূত অক্সিজেন বেড়ে যায়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ বলছে, গত এপ্রিলে মিরপুর ব্রিজের কাছের বুড়িগঙ্গার পানিতে ডিওর পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ২০ মিলিগ্রাম। তবে শিল্প-কারখানা খুলে দেয়ার কারণে বর্তমানে তা কমে ১ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম হয়েছে। এপ্রিলে গাবতলী ব্রিজের কাছে তুরাগ নদের পানিতে ডিওর পরিমাণ বেড়ে ৩ দশমিক ২ মিলিগ্রামে উন্নীত হয়েছিল। বর্তমানে তা ২ দশমিক ৫ মিলিগ্রামে নেমে এসেছে। শীতলক্ষ্যায় ডেমরা ঘাটে এপ্রিলে ডিওর পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩১ মিলিগ্রাম, যা বর্তমানে ১ মিলিগ্রামে নেমে এসেছে। বালু নদের হোসেন ডায়িং এলাকার পয়েন্টে এপ্রিলে শূন্য দশমিক ৩২ মিলিগ্রাম ডিও পাওয়া গেলেও এখন তা শূন্য দশমিক ২৫ গ্রামে নেমে এসেছে। পাঁচ নদ-নদীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মান বেড়েছিল ধলেশ্বরী নদীর পানির। এ নদীতে এ বছর এপ্রিলে ডিওর পরিমাণ হয়েছিল ৭ দশমিক ১। কিন্তু এখন ৫-এ নেমে এসেছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক একেএম রফিক আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে আমরা কিছু নমুনা নিয়েছি। প্রতিটি নমুনাতেই ঢাকার আশপাশের নদ-নদীগুলোর পানির মানের উন্নতি লক্ষ করেছি। তবে ছুটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে, যে কারণে আবার নদীর পানির মান আগের অবস্থায় ফিরছে। নদী দূষণ করে এমন কারখানা চিহ্নিত করে এরই মধ্যে কিছু কারখানার উৎপাদন বন্ধে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়া হয়েছে।

ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর দূষণের অন্যতম উৎস শিল্পবর্জ্য ও পয়োবর্জ্য। ছুটির সময় শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকায় এবং কাজ হারিয়ে ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ রাজধানী ত্যাগ করায় নদীর পানির মান উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু এ উন্নতি ধরে রাখতে না পারাটা দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিষ্ঠাতা ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে সাধারণ ছুটি থাকার কারণে নদী দূষণ উৎসগুলো বন্ধ ছিল। তাই নদীর পানির মান উন্নতি হয়েছে। এ সময়ে নদী তার প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। তবে সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদী দূষণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থাপনের কারণে এসব এলাকার নদী বেশি দূষণ হচ্ছে। নদী দূষণ রোধে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ধুলা নিয়ন্ত্রণ ও কারখানা স্থাপনের সময় নানা নিয়ম মানার কথা বলা হলেও অনেকেই এ নিয়ম মানে না। এসব কারখানা বছরের পর বছর ধরে নদী দূষণ করে এলেও প্রশাসন কারখানা বন্ধে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয় না। সরকারে উচিত হবে নদী বাঁচাতে যেসব প্রতিষ্ঠান দূষণ করছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া।

সাধারণ ছুটিকালে ঢাকার নদ-নদীর পানির মান উন্নতি একটা ভালো খবর ছিল। এ পরিস্থিতি ধরে রাখতে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণ রোধ এবং নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য সরকার শিগগিরই একযোগে অভিযান চালাবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ঢাকাসহ দেশের সব নদ-নদীকে দূষণমুক্ত করতে এ অভিযান অব্যাহত রাখা হবে। দেশের অধিকাংশ কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র (ইটিপি) নেই। থাকলেও অনেকেই খরচ কমাতে তা ইচ্ছা করে বন্ধ রাখে। এ সংস্কৃতি থেকে কারখানা মালিকদের বের হয়ে আসতে হবে। এছাড়া আমরা একটি সেন্সর আবিষ্কারের জন্য গবেষণা করছি। সেন্সরটি শিল্প-কারখানায় স্থাপন করা হলে মন্ত্রণালয়ে বসে জানা যাবে ইটিপি চালু নাকি বন্ধ। আর কোনো কারখানা যদি ইচ্ছা করে ইটিপি বন্ধ রাখে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেন্সরটি মন্ত্রণালয়ে বার্তা পাঠাবে। আশা করছি, আগামী বছর  সেন্সরটি আমরা হাতে পাব।

আরও