২০১৮ সালের ৩০ জুলাই। রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া গতিতে আসা এক বাসের চাপায় মৃত্যু হয় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর। মর্মান্তিক সে মৃত্যু ক্ষুব্ধ করে তোলে দেশের শিক্ষার্থীদের। শুরু হয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন। টানা ১০ দিন ধরে চলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, যার নেতৃত্বে ছিল ১২-১৮ বছর বয়সী স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। সেই সময় দেশের সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন নিয়ে চলাচলকারীদের আইন মেনে চলতে রীতিমতো বাধ্য করে তারা। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে তাদের সেই প্রয়াসে সাধুবাদ জানিয়েছিল দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। ওই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে পাস হয় নিরাপদ সড়ক আইন ২০১৮।
অর্ধদশক পর সেই শিক্ষার্থীরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষে অধ্যয়নরত। ওই শিক্ষার্থীরাই এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে। বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বৈষম্যবিরোধী ও প্রতিবাদী মনোভাব গড়ে উঠেছিল, সেটিই তাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনের পেছনে কাজ করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন করছে তাদের অনেকেই ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। সেই সময় তারা স্কুল-কলেজে পড়ত। ওই আন্দোলনে তাদের যে সম্মিলিত অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে, সেটিই তাদের আজকের পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়তা করেছে। তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে কালেক্টিভ কনশাসনেস বা যূথবদ্ধ সচেতনতা। অনেকেই বলছেন চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে কোমলমতি তরুণদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। তাদের কিন্তু মোটেও বিভ্রান্ত করা হয়নি। তাদের সে অভিজ্ঞতাই তাদেরকে শিখিয়েছে কীভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। সেই সময়ের ঘটনাগুলোর স্মৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়ে গেছে, যা তাদের খুব সহজেই আগের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। সবকিছু মিলিয়ে কালেক্টিভ কনশাসনেসটা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খুব দ্রুত পরিপক্ব হচ্ছে। যেখানে আগে সময় লাগত।’
তিনি আরো বলেন, ‘আবু সাঈদ গুলির মুখোমুখি যেভাবে দাঁড়ালেন, সেটি পুরো বিশ্বের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য আইকন হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কোনো মতলবি আন্দোলন বা নিছক কোটা প্রথার বিরুদ্ধে থেকে কেউ এভাবে দাঁড়াতে পারে না। এ দাঁড়ানো বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের জন্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য; দাসত্বের বিরুদ্ধে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। সর্বোপরি এ আন্দোলন যে শুধু পুঁজিবাদী বৈষম্য থেকে, তা-ও কিন্তু নয়। ন্যায়বিচার না পাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তি, বেনজীরের মতো ব্যক্তিদের হাজার কোটি টাকা লুট করার মতো বিষয়গুলোও এখানে এসেছে। সবই সচেতনভাবে হচ্ছে, তা নয়। কিন্তু অবচেতন মনে এ ডটগুলো যুক্ত হয়ে গেছে।’
চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু হয় বিক্ষোভ ও দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে কয়েক ঘণ্টার মতো অবরোধের কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। যেটির সূত্রপাত হয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়। তা ছড়িয়ে পড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও। সবশেষে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয় এ আন্দোলনে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষও এখানে সম্পৃক্ত হতে শুরু করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ঘটনাটিও প্রায় একই রকম ছিল। সে বছরের জুলাইয়ে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় নিহত হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীক ও দিয়া খানম মিম। আহত হয় আরো ১২ জন কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী। মর্মান্তিক এ ঘটনার প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। ঘটনার পরদিনই তারা নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও বরিশালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করে। পঞ্চম দিনে সারা দেশে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও এ আন্দোলনে যুক্ত হন।
সড়কের নিরাপত্তা চেয়ে চলমান শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ে, যা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় মামলা করা হয় কয়েক ডজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে।
হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যুক্ত হয় দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর মন্ত্রিসভা বৈঠকে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। যেখানে হত্যা প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর জন্য ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানা, নিবন্ধনহীন যান চালনার জন্য ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে একপর্যায়ে রাজপথ ছাড়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আঠারোর আন্দোলনে যে আঙ্গিক তৈরি হয়েছে, চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে এরই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক বা কোটা সংস্কারকে আমাদের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসের নতুন ডাইমেনশন বলা যায়। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান রাজনৈতিক দল, ছাত্র সবার সামগ্রিক আন্দোলন ছিল। কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি গত অর্ধদশকের মধ্যে ছাত্ররা দুবার নিজেরাই সংগঠিত হয়ে আন্দোলন করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা সবসময়ই পৃথিবীজুড়ে বৃহৎ শক্তি। কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে না থাকলেও অধিকারের প্রশ্নে তারা খুব সহজেই সংগঠিত হতে পারে। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সড়কে যেন শিক্ষার্থীরা মারা না যায় এবং সেটি এ রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। এবারো যে আন্দোলনটি হলো সেখানে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল কোটার সংস্কার। এখানে যখন নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে একটি দীর্ঘসূত্রতার জায়গা তৈরি হলো, তখনই ছাত্ররা নিজ থেকেই আন্দোলনে নেমেছে। তারা শান্তিপূর্ণ-স্বাভাবিক আন্দোলনেই ছিল। একটা সময় যখন ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা হলো, তখন তারা আরো গঠনমূলকভাবে আন্দোলন করল। যদিও পরবর্তী সময়ে ছাত্রদের এ আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ যুক্ত হয়েছে, তখনই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ জায়গা থেকে সরে গেল।’