নেত্রকোনা শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়

চার বছরেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়নি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে নেত্রকোনায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার চার বছরেও অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। অস্থায়ী ভবনে নানা অব্যবস্থাপনায় চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে নেত্রকোনায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার চার বছরেও অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। অস্থায়ী ভবনে নানা অব্যবস্থাপনায় চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম। শিক্ষার্থীরা থাকছেন মেসে ভাড়া বাসায়। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ সড়কের রাজুর বাজার এলাকার কয়েকটি মৌজায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর গত অক্টোবরে চার বছর পূর্ণ হয়েছে। চার বছরে প্রতিষ্ঠানটিতে কেবল শিক্ষার্থীই ভর্তি করা হয়েছে। অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। নানা অব্যবস্থাপনা আর সংকটের মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন কাটাচ্ছেন শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণীকক্ষ, আবাসন, গবেষণাগার, ক্যান্টিন, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতিচর্চাসহ বিনোদনের কোনো ধরনের সুযোগ পাচ্ছেন না তারা।

২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি মন্ত্রিসভায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নীতিমালা পাস করা হয়। ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর নেত্রকোনা পৌরসভার রাজুর বাজার এলাকায় টিটিসির একটি তিনতলা ভবনে যাত্রা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির। চার বছর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু মাটি ভরাটের কাজ চলেছে। তাও কাজ হয়েছে প্রায় ৫০ ভাগ। কোনো ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি চার বছরেও। একই বছরে আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়। গত আগস্ট তার মেয়াদ শেষ হলে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্ব পান সুব্রত কুমার আদিত্য। গত সেপ্টেম্বর উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম কবীর। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৫৬।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি পরের বছর থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি অনুষদের অধীন চারটি বিভাগের শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৩১৫। তাদের মধ্যে ছাত্র ১৮৫ জন, ১৩০ জন ছাত্রী। আর শিক্ষক আছেন ১১ জন। তারা সবাই প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। চার বছরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অধ্যাপক, সহযোগী বা সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়নি।

ছাত্রদের জন্য জেলা শহরের সাতপাই এবং ছাত্রীদের জন্য নাগড়া এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব বাসায় মাত্র ৪১ জন ছাত্রী ৪৬ জন ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা আছে। বাকি শিক্ষার্থীদের মেসে থাকতে হয়। অনেকেই টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ চালান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা, ইংরেজি অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, তাদের তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টার পরীক্ষা চলছে। বছর খানেকের মধ্যে অনার্স শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এত দিনেও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। প্রভাষকদের কাছে পাঠ নিয়েই কাটিয়ে দিতে হচ্ছে অনার্সের শিক্ষাজীবন।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার আদিত্য জানান, করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের গতি কিছুটা পিছিয়েছে। অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক পদে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন। সময় তিনি কাজের গতি বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

প্রকল্প এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গিয়েছে, বিস্তীর্ণ এলাকায় শুধু বালি আর বালি। প্রকল্প এলাকায় ভেকু দিয়ে বালি মাটি সমান করার কাজ চলছে। খোলা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে সিমেন্টের খুঁটি।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে একনেকে হাজার ৬৩৭ কোটি ৪০ লাখ ৯৯ হাজার টাকা অনুমোদন দেয়া হয়। সদর উপজেলার রামপুর, সাহিলপুর, গোবিন্দপুর, কান্দুলিয়া রায়দুমরুহি মৌজায় ২৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৫০০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণ হওয়া ওই জায়গা নিচু হওয়ায় ৬৫ লাখ ঘনমিটার বালি ভরাটের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নুরুজ্জামান খানকে কার্যাদেশ  দেয়া হয়। আগামী বছরের ২৭ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজের গড় অগ্রগতি মাত্র ৪৬ শতাংশ।

গত জানুয়ারি ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবন এবং ১০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে তলাবিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়। আগামী জুনের মধ্যে দুটি ভবনের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাইলিংয়ের কাজ শুরু করেছে মাত্র।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মো. আনিস মাহমুদ জানান, আগামী বছরের জুন মাস নাগাদ কাজের অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। এছাড়া ছয়টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম কবীর বলেন, আমি এখানে যোগদান করেছি মাত্র দুই মাস। প্রকল্প এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। নিয়মিত তদারকি করছি। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, কনসালট্যান্টসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসা হয়েছিল। ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। আশা করছি আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে কয়েকটি ভবন নির্মাণ হয়ে যাবে।

আরও