কারা হাসপাতালে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ হচ্ছে না

দেশের কারাগারগুলোয় বন্দিদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে হাসপাতাল। সেখানে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এসব ওষুধ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। এমনকি বিভাগীয় কারা হাসপাতালেও নেই ওষুধ সংরক্ষণে ফ্রিজিংয়ের ব্যবস্থা। এক্সেরে মেশিনও দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থেকে এখন বিকল। বন্দিদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে

দেশের কারাগারগুলোয় বন্দিদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে হাসপাতাল। সেখানে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এসব ওষুধ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। এমনকি বিভাগীয় কারা হাসপাতালেও নেই ওষুধ সংরক্ষণে ফ্রিজিংয়ের ব্যবস্থা। এক্সেরে মেশিনও দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থেকে এখন বিকল। বন্দিদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 

দেশের কারাগারগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়মিত পরিদর্শন করে থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা ও সেবা বিভাগ। গত জুনে চট্টগ্রাম কারাগার পরিদর্শন শেষে ওষুধ সংরক্ষণ ও নিরীক্ষা সরঞ্জামে ত্রুটি পায় পরিদর্শন কমিটি। এছাড়া কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থায় নানা ত্রুটির বিষয়ও উঠে আসে পরিদর্শন কমিটির প্রতিবেদনে। সেখানে বন্দিদের ওষুধ সংরক্ষণে স্টোরেজে ফ্রিজের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হয়। পাশাপাশি কারাগারের এক্সরে মেশিন দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার বিষয়টি নজরে এনে সরঞ্জামটি বন্দিদের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার অনুরোধ করা হয়েছে। 

এ কারাগারের জন্য দুজন অনুমোদিত চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আছেন একজন। তাকেই প্রতিদিন কারা হাসপাতালের বহির্বিভাগে অন্তত ২৫০ আসামির সেবা দিতে হয়। রুটিন চেকআপের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও সেখানে নেই। 

চট্টগ্রাম কারাগার পরিদর্শনে যাওয়া সহকারী সচিব হাফিজুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কারাগার পরিদর্শনের সময় ফ্রিজিং সংকটের বিষয়টি লক্ষ করা যায়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধ একটি সংবেদনশীল পণ্য। তাপমাত্রার কিছুটা হেরফের হলেই কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। দেশের বাজারে প্রচলিত ওষুধের প্রায় ৯০ শতাংশই ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণযোগ্য। এসব ওষুধ ঠাণ্ডা ও শুকনা স্থানে আলো থেকে দূরে রাখতে হয়। গরমের সময় দেশের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ২৮-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও মাঝেমধ্যে তা ৪০ ডিগ্রিও অতিক্রম করেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে ওষুধের ওপর। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা না হলে তার গুণাগুণ নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। কিছু অতিসংবেদনশীল ওষুধ রয়েছে, যেগুলো তাপমাত্রা বাড়লেই নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন ধরনের হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক, ব্লাড প্রডাক্ট ইত্যাদি। এগুলো বায়োসিমিউলেশন প্রডাক্ট, অর্থাৎ বায়োমলিকুলার ওষুধগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় নষ্ট হয়ে যায়। বেশির ভাগ ওষুধই কেমিক্যাল প্রডাক্ট। তবে এখন ওষুধগুলো বায়োমলিকুলার করা হচ্ছে। বায়োমলিকুলার ওষুধের একটি বড় সমস্যা হলো, এসব ওষুধ একটু বেশি তাপমাত্রা পেলেই নষ্ট হয়ে যায়।’ 

ওষুধের কার্যকারিতা রক্ষায় পরিবহন, বিপণন, মজুদ ও সংরক্ষণের প্রতিটি স্তরকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটিসহ বিভিন্ন দেশে অনুসৃত নীতিমালা অনুযায়ী, ফার্মেসি, ওষুধ কারখানাসহ প্রতিটি স্তরে একইভাবে ওষুধ সংরক্ষণ করতে হবে। সাধারণ স্টোরেজ বা সংরক্ষণের তাপমাত্রার পরিসীমা ১৫-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মোটা ওষুধভেদে সংরক্ষণযোগ্য তাপমাত্রার ধরনগুলো হলো ঘরের তাপমাত্রা (রুম টেম্পারেচার), শীতল (কুল স্টোরেজ), অতি শীতল (কোল্ড স্টোরেজ) ও হিমাঙ্কের নিচে (ফ্রিজ)। রুম তাপমাত্রা ওষুধের জন্য সাধারণ অবস্থা। বেশির ভাগ ওষুধ এ তাপমাত্রায় রাখা যায়। এ তাপমাত্রা জীবাণুর বৃদ্ধি ও রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বাধা দেয়ার জন্য আদর্শ। কিছু ওষুধ সংরক্ষণের জন্য হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রার প্রয়োজন পড়ে। এসব ওষুধ সংরক্ষণ করা হয় ২৫-৩৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা মাইনাস ৪ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

ওষুধ সংরক্ষণে ত্রুটি রয়েছে দেশের অন্যান্য কারা হাসপাতালেও। রাজশাহী বিভাগের আটটি কারাগার থেকে অসুস্থ বন্দিদের রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে নিজস্ব কোনো চিকিৎসক নেই। এ হাসপাতালে একজন সহকারী সার্জন, একজন ফার্মাসিস্ট, নার্স ও একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান পদের মধ্যে শুধু নার্স ও টেকনিশিয়ান রয়েছেন। সহকারী সার্জনের পদটি দীর্ঘদিন শূন্য। ফার্মাসিস্টও নেই। তাই রাজশাহী সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে একজন চিকিৎসককে এ হাসপাতালে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। দেড় হাজার বন্দির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এ কারাগারে বর্তমানে আড়াই হাজারেরও বেশি বন্দি রয়েছে। 

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের (কেরানীগঞ্জ) ১৭২ শয্যার কারা হাসপাতালে চিকিৎসক মাত্র দুজন। ইসিজি মেশিন থাকলেও এক বছর ধরে পড়ে আছে নতুন এক্সরে মেশিনটি। শুধু কাশিমপুর কারাগারের নারী বন্দি ছাড়া দেশের সব কারাগার থেকে ঢাকা কারাগারে বন্দি রোগীরা আসে চিকিৎসা নিতে। প্রথমে রোগীদের কারা হাসপাতালে রাখা হয়। পরে সেখান থেকে নিয়মানুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য কারারক্ষীদের প্রহরায় তাদের ঢাকার সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু কারা হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের পাশাপাশি বাইরের জেলা কারাগার থেকে আগত রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। সেখানে নতুন এক্সরে মেশিনটি টেকনিশিয়ান না থাকার কারণে চালু করা যাচ্ছে না। 

এ হাসপাতালে কম করে হলেও ১০ জন চিকিৎসক, পাঁচজন নার্স ও দুজন ল্যাব টেকনিশিয়ান প্রয়োজন। এছাড়া ফিজিওথেরাপি মেশিন ও ফিজিওথেরাপিস্ট কোনোটাই নেই। স্ট্রোকজনিত রোগে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বন্দি রোগীও আছে। সেসব রোগীকে থেরাপি দিতে হয়। 

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৭২ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, ওয়ার্ডবয় নেই, রেডিওলজিস্ট নেই, টেকনোলজিস্ট নেই। হাসপাতালে ভর্তির মতো চার শতাধিক বন্দি আছে। কিন্তু তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার বেশি কিছু দেয়া যাচ্ছে না।

কারা অভ্যন্তরে বন্দিদের চিকিৎসা সংকটের বিষয়টি অধিদপ্তরের অংশীজনসভায় জানান ময়মনসিংহ বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির। তিনি বলেন, সহকারী সার্জন ছুটিতে থাকাকালীন বন্দিদের চিকিৎসাসেবা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাহত হয়। সহকারী সার্জনের ছুটিকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ডাক্তার পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধি এবং কারা মহাপরিদর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। 

দেশের কারা হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক নিয়োগের নীতিমালা (খসড়া) হাইকোর্টে জমা দিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

এ-সংক্রান্ত শুনানিতে কারা অধিদপ্তরের আইনজীবী শফিকুল ইসলাম আদালতকে জানান, কারা হাসপাতালগুলোয় সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১৩৭ চিকিৎসকের শূন্যপদ রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারাগারে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে পর্যায়ক্রমে সেখানে কারা হাসপাতাল করা হয়েছে, বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওষুধ সংরক্ষণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

আরও