বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিদেশী দুই শতাধিক কোম্পানি। প্রতি বছরই এ কোম্পানিগুলো বিপুল অংকের অর্থ নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেবল গত পাঁচ অর্থবছরে (২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬) বিদেশী কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ, মুনাফা ও আয় হিসেবে ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন বা ৬১৫ কোটি ডলার নিজেদের দেশে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশী মুদ্রার গড় বিনিময় হারের ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনকৃত এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। অর্থ প্রত্যাবাসনের শীর্ষে টেলিযোগাযোগ, তেল, গ্যাস, খনিজ ও বিদ্যুৎ, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, ব্যাংক, বীমা ও লিজিং এবং অন্যান্য খাতের কোম্পানি রয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
ডলার সংকটের কারণে কয়েক বছর দেশে ব্যবসারত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন, রয়্যালটি ফি পরিশোধ ও বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনে সমস্যার মুখে পড়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কভিডের সময় ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রত্যাবাসন হয়েছিল ১৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। আলোচ্য অর্থবছরের গড় বিনিময় হার অনুসারে এর পরিমাণ ১২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এর পরের বছর ২০২২-২৩-এ তা প্রায় ৫২ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৬৬ কোটি ৫ লাখ ডলারে, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ৭ হাজার ১ কোটি টাকা। ওই সময় দেশে তীব্র ডলার সংকট ছিল এবং বিনিময় হার ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বেড়ে ১০৬ টাকায় উঠে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রত্যাবাসন আবার বেড়ে হয় ১১১ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। গড় বিনিময় হার অনুসারে এর পরিমাণ ১৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রত্যাবাসনের পরিমাণ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫২ কোটি ৪৩ লাখ ডলারে (১৮ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা) পৌঁছায়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাবাসন হয়েছে ১৪৬ কোটি ৩ লাখ ডলার (১৭ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা), যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট অন্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে দেশে ডলার সংকট শুরু হয়। আর ২০২৩ সালে তা তীব্র আকার নেয়। এ কারণে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন বছর বিদেশী অনেক কোম্পানি মুনাফা প্রত্যাবাসন করতে পারেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকেও এ বিষয়ে বিধিনিষেধ ছিল। এ কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুনাফা প্রত্যাবাসন মাত্র ৬৬ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে মুনাফা প্রত্যাবাসনে বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। এতে ২০২২ সালসহ পরবর্তী তিন বছরের মুনাফাও গত বছর প্রত্যাবাসন হয়েছে। এ কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রত্যাবাসনকৃত অর্থের পরিমাণ দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বিদেশী কোম্পানিগুলোর বিপুল মুনাফা প্রত্যাবাসনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে বিদেশী কোম্পানিগুলোর বিপুল পরিমাণ মুনাফা প্রত্যাবাসনের অর্থ হলো এ দেশে বিনিয়োগ করলে ভালো মুনাফা করা যায়। আমরা অন্য বিদেশী কোম্পানিগুলোকেও আহ্বান করব, আপনারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসুন। এখানে ব্যবসা উপযোগী পরিবেশ, খাত ও মুনাফা করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।’
বিদেশী কোম্পানির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘বিদেশী কোম্পানিগুলোর হাত ধরে দেশে মূলধনের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এসেছে। এসব কাজে লাগিয়ে তারা বিপুল মুনাফা করছে। এখান থেকে দেশের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের শেখার আছে। আমরা চাই দেশের উদ্যোক্তারাও বিদেশী কোম্পানিগুলোকে দেখে এগিয়ে আসুক। তাতে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’
বাংলাদেশ থেকে মুনাফা প্রত্যাবাসনে শীর্ষে অবস্থান করছে পাঁচটি খাতের কোম্পানি। টেলিনর মোবাইল কমিউনিকেশনস এএস (নরওয়ে) হচ্ছে দেশের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক। গ্রামীণফোনের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ২০০২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরে গ্রামীণফোন থেকে টেলিনর লভ্যাংশ পেয়েছে ২২ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।
টেলিযোগাযোগ খাতের আজিয়াটা ইনভেস্টমেন্টস (লাবুয়ান) লিমিটেড (মালয়েশিয়া) মালয়েশিয়ার অ্যাক্সিয়াটা গ্রুপের শাখা। এ কোম্পানি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেডের ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক। ভারতি ইন্টারন্যাশনাল (সিঙ্গাপুর) প্রাইভেট লিমিটেড হচ্ছে ভারতি এয়ারটেলের মালিকানাধীন কোম্পানি। এ কোম্পানির কাছে রয়েছে রবি আজিয়াটার ২৮ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ার। গত পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে টেলিযোগাযোগ খাতের শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় আজিয়াটা ও ভারতি ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে।
তেল, গ্যাস, খনিজ ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানির মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ। শেভরন উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) আওতায় বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাস ক্ষেত্র পরিচালনা করে। কোম্পানিটি সব গ্যাস ও কনডেনসেট বিক্রি করে পেট্রোবাংলার কাছে। বিবিয়ানা ২০০৭ সালে উৎপাদনে আসে এবং এখন দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস ক্ষেত্র। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, তারা দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং কনডেনসেটের ৮৩ শতাংশ উৎপাদন করে। বাংলাদেশে তাদের প্রকল্পের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডও অর্থ প্রত্যাবাসনের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত এ প্রতিষ্ঠান সামিট করপোরেশন লিমিটেডের মূল কোম্পানি। এর অধীনে সামিট পাওয়ার লিমিটেড দেশে ১৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করে, যার মোট স্থাপিত সক্ষমতা ৯৭৫ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট। ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আইএফসি ও সহবিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অংশীদারত্বে সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল গঠিত হয়। জাপানের জেরা ২০১৯ সালে ৩৩ কোটি ডলারে এর ২২ শতাংশ শেয়ার কেনে। এছাড়া ভিক্টোরিয়া হোল্ডিংস বি.ভি. এ খাতে গত পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম।
তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে অর্থ প্রত্যাবাসনে শীর্ষে রয়েছে আর-প্যাক ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোং এলএলসি (যুক্তরাষ্ট্র), ইউনিচেলা (প্রাইভেট) লিমিটেড (শ্রীলংকা) ও পাক্সার বি.ভি. (নেদারল্যান্ডস)।
নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর-প্যাক ইন্টারন্যাশনাল বৈশ্বিক পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় লেবেল ও প্যাকেজিং সামগ্রী সরবরাহকারী। বিশ্বজুড়ে ২৫টির বেশি স্থানে তাদের কার্যক্রম আছে। শ্রীলংকার প্রতিষ্ঠান ইউনিচেলা ১৯৮৬ সালে মার্কিন প্রতিষ্ঠান মাস্ট ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে অংশীদারত্বে যাত্রা করে এবং নারীদের অন্তর্বাস তৈরিতে সুপরিচিত। পাক্সার গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাভেরি ডেনিসনের অংশ। অ্যাভেরি ডেনিসন ২০০৭ সালে পাক্সার করপোরেশন অধিগ্রহণ করে। বাংলাদেশে পাক্সার বাংলাদেশ লিমিটেড শতভাগ রফতানিমুখী পোশাকের লেবেল প্রস্তুতকারক এবং রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) কাজ করে।
ব্যাংক, লিজিং ও বীমা খাতের শীর্ষ তিন প্রত্যাবাসনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (লন্ডন), আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (আলিকো) এবং এএসপি ফিন অ্যাসেট অ্যান্ড লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট (হংকং)। ১৯০৫ সাল থেকে কার্যক্রম চালানো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশী ব্যাংক। আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি বাংলাদেশে ১৯৫২ সাল থেকে কার্যক্রম চালানো বৃহত্তম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান। ২০১৫ সালে এটি ‘মেটলাইফ’ ব্র্যান্ডে নাম বদলায়, তবে নিবন্ধিত নাম আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিই আছে। ২০১০ সাল থেকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন।
অন্যান্য খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ইউনিলিভার ইউকেসিআর লিমিটেড, দ্য র্যালে ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং ম্যারিকো লিমিটেড গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনকারী শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় রয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্য ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০২০ সালে ইউনিলিভার ২ হাজার ২০ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) বাংলাদেশের ৮২ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। দ্য র্যালে ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড হচ্ছে দেশের তামাক খাতের বৃহৎ কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানির (বিএটিবিসি) মূল শেয়ারহোল্ডার। বিএটিবিসির ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে দ্য র্যালে ইনভেস্টমেন্টের কাছে।
ভারতের ম্যারিকো লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি হচ্ছে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড। বাংলাদেশের কোম্পানিটির ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা রয়েছে ভারতের মূল কোম্পানির কাছে। বাংলাদেশে ম্যারিকো ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করছে। গত পাঁচ বছরে ম্যারিকো বাংলাদেশ ভারতীয় মূল কোম্পানির কাছে লভ্যাংশ বাবদ ২ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রত্যাবাসন করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। এ কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ও মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফলে সেটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাছাড়া ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে মুনাফা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থ প্রত্যাবাসনে সমস্যায় পড়ার কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশের পরিমাণও কমেছে। তালিকাভুক্ত ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির তিন হিসাব বছরের (২০২১ থেকে ২০২৩) লভ্যাংশ দেয়ার পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে ছয়টি কোম্পানির ডিভিডেন্ড পেআউট রেশিও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বর্তমানেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর আগের বছরের তুলনায় মুনাফা প্রত্যাবাসনের পরিমাণ কমতে পারে। কারণ ব্যবসা ভালো না হলে বা মুনাফায় প্রবৃদ্ধি না থাকলে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে লভ্যাংশ ঘোষণার পরিমাণ কমে যেতে পারে। আমরা যদি পুঁজিবাজারের বড় ১০টি কোম্পানির দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে—কোনো কোনো কোম্পানির মুনাফা বেড়েছে, আবার অনেক কোম্পানির কমেছে; কারো কারো ক্ষেত্রে লোকসানও হয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বড় কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। যার প্রতিফলন জিডিপির পূর্বাভাস এবং প্রকৃত অর্জিত জিডিপির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।’
বাংলাদেশে যে তিনটি উপখাতে বিদেশী বিনিয়োগের হিসাব করা হয় তার মধ্যে রিইনভেস্টেড আর্নিংস ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের অংশটিই বড় থাকে। তবে বিদেশী বিনিয়োগের প্রকৃত প্রতিফলন পাওয়া যায় মূলত ইকুইটি ক্যাপিটালে, যা হলো নতুন মূলধন। বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে নতুন বিদেশী বিনিয়োগ না আসায় এ হিস্যা কমই থাকে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পাশাপাশি ইকুইটি মূলধনের প্রবাহও কমেছে। আলোচ্য অর্থবছরে ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার ইকুইটি মূলধন দেশে এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম।
বিশ্বব্যাপী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ধাপভিত্তিক মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান (এমএনই)। উৎপাদন নেটওয়ার্ক সংগঠিত করা, মানদণ্ড নির্ধারণ ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো এ ভূমিকা পালন করে। তবে বাংলাদেশে পণ্য ও সেবার মূল্য সংযোজন এবং রফতানি খাতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ সীমিত। সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘গ্লোবাল ভ্যালু চেইনস অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট: এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট পলিসি রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অবদান জিডিপির ৫ শতাংশেরও নিচে। আবার রফতানিতেও এমএনইগুলোর অবদান ৫ শতাংশে পৌঁছায়নি।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে কেবল মূলধন নিয়ে আসে না। তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনাও নিয়ে যায়। রফতানির ক্ষেত্রে নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও বাজার সৃষ্টির পথ দেখায়। এসএমই খাতে বিদেশীরা সাপ্লাই চেইন লিংকেজ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমরা দেখছি, বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ স্থানীয় বাজার বা উদ্যোক্তা তৈরিতে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারেনি।’
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাত বিদেশীদের হাত ধরেই এসেছিল উল্লেখ করে মাসরুর রিয়াজ আরো বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে কেবল এ খাতে স্থানীয় উদ্যোক্তা, নতুন পণ্য ও বাজার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিদেশী বিনিয়োগে এসএমই খাতের সাপ্লাই চেইন লিংকেজ তৈরি হয়নি। এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ ছিল। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে আরো বেশি বিদেশী বিনিয়োগ লাগবে।’