হাওর : জলের জীবন

দূষণে বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

টাঙ্গুয়ার হাওরে রেকর্ডকৃত প্রায় ১৪১ প্রজাতির মাছের মধ্যে অন্তত আটটি প্রজাতিকে ‘মহাবিপন্ন’ এবং ২০টি প্রজাতিকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইইউসিএন। মহাশোল, বাগাড়, চিতল, পাবদা, রিটা, ঘারুয়া, আইড় ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত বন্য পাঙাশসহ এক সময়ের সমৃদ্ধ মাছের অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

মেঘালয় পাহাড়ের কোলঘেঁষে থাকা দেশের দ্বিতীয় ‘রামসার সাইট’ ও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। হিজল-করচের জলমগ্ন বন, টলটলে স্বচ্ছ পানি আর পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে ভরা এ জলাভূমি রূপসী বাংলার এক অনন্য স্বর্গরাজ্য। কিন্তু চোখজুড়ানো এ সৌন্দর্যের আড়ালেই দিন দিন বিপন্ন হয়ে পড়ছে হাওরের হাজার বছরের চেনা বাস্তুসংস্থান।

বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য, উচ্চ শব্দে গান, হাউজবোটের অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা টাঙ্গুয়ার হাওরের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন বাংলাদেশের সর্বশেষ রেড লিস্ট এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মাঠপর্যায়ের গবেষণা অনুযায়ী, হাওরের অন্তত ৫৪টি দেশী মাছ ও ১২ প্রজাতির পাখি জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে মহাবিপন্ন ও হুমকির মুখে রয়েছে।

টাঙ্গুয়ার হাওরে রেকর্ডকৃত প্রায় ১৪১ প্রজাতির মাছের মধ্যে অন্তত আটটি প্রজাতিকে ‘মহাবিপন্ন’ এবং ২০টি প্রজাতিকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইইউসিএন। মহাশোল, বাগাড়, চিতল, পাবদা, রিটা, ঘারুয়া, আইড় ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত বন্য পাঙাশসহ এক সময়ের সমৃদ্ধ মাছের অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এছাড়া হাওরের ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু রুই (বন্য জাত), কালবাউশ, ফলি, গিলটি বাচা ও রানী মাছের মতো বিপন্ন প্রজাতিগুলোর বংশবৃদ্ধিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক মৎস্যসম্পদের জন্য বড় বিপর্যয়ের সংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইইউসিএনের জরিপে আরো বলা হয়েছে, আবাসস্থল হারিয়ে বিপন্ন হয়ে পড়ছে পরিযায়ী ও দেশী পাখির বিভিন্ন প্রজাতি। শীতকালে লাখো পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখর হওয়া টাঙ্গুয়ার হাওরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাখির আগমন প্রায় ৭৭ শতাংশ কমে গেছে বলে পাখি বিশেষজ্ঞদের জরিপে উঠে এসেছে।

হাওরে রেকর্ডকৃত ২০৮ প্রজাতির পাখির মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে চরম হুমকির মুখে রয়েছে ১২টি প্রজাতি। এর মধ্যে মহাবিপন্ন তালিকায় রয়েছে অত্যন্ত বিরল পরিযায়ী পাখি বেয়ারের ভুঁতিহাঁস ও বাঙাল শকুন। এছাড়া হাওরের স্থায়ী শিকারি পাখি পাল্লাসের কুড়ুয়া (মেছো ঈগল), মরচেপা ভুঁতিহাঁস, পাতি ভুঁতিহাঁস ও বড় গুটিঈগলের মতো ১০টি বিপন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ পাখি খাদ্য ও নিরাপদ আবাসস্থলের অভাবে হাওর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

টাঙ্গুয়ার তীরবর্তী মানুষজন অভিযোগ করে জানান, আগে যে পরিমাণ মাছ পানিতে দেখা যেত, তার কিছুই এখন নেই। নানা প্রজাতির মাছ ও পাখি বিলুপ্তির পথে। উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স বাজানোর কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি শিশুর পড়াশোনা এবং অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষেরও সমস্যা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরে অবাধে ঘুরছে ২০০-এর বেশি হাউজবোট। এসব বোটে উচ্চ শব্দে জেনারেটর ও গানবাজনা চলছে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে পলিথিনসহ প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর নানা বর্জ্য। একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে যে পাখি কিংবা মাছ দেখা যেত, এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। অথচ জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ জলাভূমি হিসেবে ঘোষিত এ হাওরে ট্রলারচালিত নৌকা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, নজরদারির অভাবে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে টাঙ্গুয়ার হাওর।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এমদাদ হোসেন বলেন, ‘পানির ওপর ভেসে থাকা সত্যিই এক অন্যরকম অনুভূতি। তবে পানির ওপর ভাসমান প্লাস্টিকের বোতল আর চিপসের প্যাকেট দেখে খুব খারাপ লেগেছে। অনেকেই জোরে গান বাজাচ্ছেন, যা এই নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে একদমই মানানসই নয়।’

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাশেদ আদনান বলেন, ‘আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঘুরতে এসেছি। এখানে এসে যা দেখলাম, তাতে মনে হয়েছে এ সৌন্দর্য উপভোগের চেয়ে হাওরের প্রাণ রক্ষা করা জরুরি। আমাদের এখনই ভাবতে হবে—পর্যটন, নাকি হাওর, কোনটা বেশি জরুরি।’

স্থানীয় হাওরপাড়ের বাসিন্দা শুনু মিয়ার বক্তব্যেও উঠে এসেছে হতাশা। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও পানিতে নামলে হরেক পদের দেশী মাছ চোখে পড়ত। শীতের সময় হাজার হাজার পাখির ডাকে ঘুম ভাঙত। এখন ইঞ্জিনের বিকট শব্দ আর ক্ষতিকর বর্জ্যের কারণে মাছ আর আগের মতো পাওয়া যায় না, পাখিরাও নিরাপদ আশ্রয় হারিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।’

আপলিফটমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘‌প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং হাউজবোটগুলোর অব্যবস্থাপনার কারণেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে।’

তিনি বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরে ভূমি, পানি এবং বায়ুদূষণের সমস্ত কর্মযজ্ঞ সম্পাদিত হয়। উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স বাজানো হয়। নেচে-গেয়ে এটাকে উৎসব সাইটে পরিণত করা হয়েছে, যা ইসিএ ও রামসার সাইটের পরিপন্থী।’

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হুমায়ুন কবীর লিটন কিছুদিন আগে টাঙ্গুয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, ‘হাওরে এখন ২০০-এর বেশি হাউজবোট ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল করছে। অনেক বোটে জেনারেটরের বিকট শব্দ আর বিষাক্ত কাঁচা তেল পানিতে মিশছে। সংরক্ষিত অভয়ারণ্য এলাকায় ট্রলার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে লিটন জানান, এক দশকে হাওরের দেশী ও পরিযায়ী পাখির সংখ্যা অনেকাংশে কমে গেছে।

তাহিরপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, ‘‌হাওরের পরিবেশ ও ইকোট্যুরিজম রক্ষায় নীতিমালা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, হাউজবোটগুলোর নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

আরও