বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের উদ্যোগ

দিনাজপুরে ভূমি অধিগ্রহণের আগেই কৃষিজমিতে তৈরি হচ্ছে স্থাপনা

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি আবিষ্কৃত হয় ১৯৮৫ সালে।

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি আবিষ্কৃত হয় ১৯৮৫ সালে। শুরুতে এর আয়তন ছিল ৬ দশমিক ৬৮ বর্গকিলোমিটার। খনির প্রয়োজনে ১৯৯৩-২০০৭ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নতুন করে খনির আয়তন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য আরো ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। অধিগ্রহণের আগে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করতে ৫০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটিও করা হয়েছে। তবে তার আগেই খনির উত্তর দিকে দুটি গ্রামের কৃষিজমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা।

স্থানীয়রা বলছে, খনির উত্তর দিকে হামিদপুর ইউনিয়নের বাশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। সিঙ্গাপুর সিটি, বেগমপাড়া, গুলশান, বারিধারা নামে শহর গড়ে উঠছে।

হামিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মিনহাজুল হক বুলবুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়লা খনি উত্তর দিকে সম্প্রসারিত হবে। খনি কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণ করবে। বাজার দামের চেয়ে চার গুণ বেশি দাম দেবে জমির। পাকা স্থাপনার জন্য ক্ষতিপূরণ সে অনুপাতে পাওয়া যাবে এ আশায় বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামে অট্টালিকা নির্মাণ হচ্ছে। অথচ এসব বাড়িতে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। প্রায় দুই বছর ধরে এ ধরনের বহুতল ভবন নির্মাণ চলছে। বাড়িগুলোর মালিক কারা, কোথাকার মানুষ, কী তাদের পরিচয় কেউ-ই জানে না।’

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘১৯৯৩-২০০৭ সাল পর্যন্ত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির প্রয়োজনে কয়েক দফায় ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন-২০১৭ অনুযায়ী, জেলা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট মৌজার জমি গত তিন বছরে যে দামে বিক্রি হয়েছে, তার গড় হিসাব করে অধিগ্রহণকৃত জমি ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ করা হবে।’

সরজমিনে দেখা গেছে, খনির ঠিক উত্তর দিকে প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে বাশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামজুড়ে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। ফসলি জমি ভরাট করে দুই শতাধিক অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। বাঁশপুকুর গ্রামের পশ্চিম পাশে ধানখেত পেরিয়ে বাঁশপুকুর মৌজার কাজীপাড়া গ্রাম। ওই গ্রামে দুই শতাধিক বসতি। একসময় গ্রামটির ৯০ শতাংশ বাড়ি মাটির তৈরি ছিল। হঠাৎ করেই মাটির বাড়িগুলো ভেঙে দোতলা, তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে।

গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১০ বছর আগে খনি এলাকায় ১০টি গ্রামে কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ ৬৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। যার মূল্য পরিশোধ করে খনি কর্তৃপক্ষ। সেসব জমি বা বাড়ির মালিকরা অন্যত্র চলে গেছেন। তাদের পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি ও চাতালের ইট, কাঠ, রড তারা বিক্রি করছেন বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়ায় নতুন করে বাড়িঘর নির্মাণকারীদের কাছে। গ্রাম দুটির আশপাশে রাস্তার ধারে ফাঁকা জায়গায় ট্রাক্টর বোঝাই করে নিম্নমানের ইট এনে জমা করা হচ্ছে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সূত্রে জানা গেছে, আগামীতে খনি উত্তর দিকে সম্প্রসারণে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় জরিপ বা সার্ভের কাজ চলছে। ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ছয়টি বোর হোল করে ভূ তাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরবর্তী ফেইস ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় নকশা তৈরি করে এক বছর আগেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবু তালেব ফারাজী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অধিগ্রহণের আগে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ১৩টি গ্রামে বসবাসকারীদের দিয়ে ৫০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার আগেই খনির উত্তর দিকের গ্রাম দুটিতে কিছু মানুষ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বিশাল বিশাল দালান গড়ে তুলছেন। যা সত্যিই অবাক করার মতো বিষয়।’

সরজমিন বিষয়টি পরিদর্শন করতে গত ২৭ আগস্ট আবু তালেব ফারাজীসহ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জানে আলম ও জেলা প্রশাসক কার্যালয় এবং খনির কয়েকজন কর্মকর্তা বাশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামে যান। তবে ভবন মালিকদের লোকজন কেউ মুখ খোলেননি। এমনকি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ড্রোন দিয়ে ছবি ও ভিডিও চিত্র ধারণ করতে চাইলে এলাকাবাসী তুলতে দেননি। তাদের প্রতিরোধের মুখে সবাই ফিরে আসতে বাধ্য হন।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. জানে আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কাছ থেকে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয় নকশাসহ প্রস্তাব জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এসেছে। বিষয়টি একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন চুড়ান্ত করার পর ফাইল ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হবে। প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন পেলে এলাকাবাসীর কাছে চার ধারায় নোটিস পাঠানো হবে। নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। অধিগ্রহণ নীতিমালা অনুযায়ী জরিপ ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কতদিন সময় লাগবে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না।’

আরও