গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের দেয়া প্রতিবেদন বাতিলসহ ১২ দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। শনিবার (৩ মে) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিলসহ চার দফা দাবিতে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশে এসব ঘোষণা করেন হেফাজত নেতারা। একই সঙ্গে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিন মাসের মধ্যে বিভাগীয় সম্মেলন এবং আগামী ২৩ মে জুমার নামাজের পর চার দফা আদায়ে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন তারা।
শনিবার সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশে অংশ নেন। যার ফলে পাশ্ববর্তী এলাকায় যান চলাচল সীমিত হয়ে যায়। সমাবেশে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তিনি বলেন, ‘এখন দেশে ইসলামবিরোধী একটি গোষ্ঠী আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সম্প্রতি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন পবিত্র কুরআন বিরোধী প্রতিবেদন দাখিল করেছে। যা এ দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, বিধি-বিধান, ঐতিহ্য ও পরিবারকাঠামো ধ্বংস করার পাশ্চাত্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে। হেফাজতে ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। সরকারকে আমরা হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, এনজিওবাদী গোষ্ঠীর প্ররোচনায় এমন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না, যা কুরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে যায়। এক্ষেত্রে আমরা কোনো ছাড় দেব না। এই বিতর্কিত কমিশন ও কুরআনবিরোধী প্রতিবেদন অবিলম্বে বাতিল করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীদার আলেম-ওলামার পরামর্শ নিয়ে নতুন কমিশন গঠন করুন। নারীদের শিক্ষা ও কর্ম ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।’
সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের ১২ দফা দাবি তুলে ধরেন নায়েবে আমির মাওলানা মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, ‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ও তাদের কোরআনবিরোধী প্রতিবেদন অবিলম্বে বাতিল করে আলেম-ওলামাদের পরামর্শক্রমে নারী সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কমিশন গঠন করতে হবে। নারীর সামাজিক উন্নয়নে পশ্চিমা মূল্যবোধ নয় বরং আমাদের নিজস্ব সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলোকেই বাস্তবমুখী সংস্কারের দিকে যেতে হবে; সংবিধানের মূলনীতিতে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করতে হবে। ধর্মপ্রাণ গণমানুষের ঈমান ও আমল রক্ষার্থে বহুত্ববাদ নামক আত্মঘাতী ধারণা থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। এছাড়া লিঙ্গ পরিচয়, লিঙ্গ বৈচিত্র্য, লিঙ্গ সমতা, তৃতীয় লিঙ্গ বা থার্ড জেন্ডার ইত্যাদি শব্দের মারপ্যাঁচে, কাউকে বাদ দিয়ে নয়; এমন ধোঁয়াশাপূর্ণ স্লোগানের অন্তরালে এবং অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দের আড়ালে এলজিবিটি এবং ট্রান্সজেন্ডারবাদের স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সমাজবিধ্বংসী ধর্মবিরুদ্ধ সমকামীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে; শাপলা চত্বর ও জুলাই গণহত্যার বিচারে গতি আনতে ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে।’
মাহফুজুল হক বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগেই শেখ হাসিনা ও তার চিহ্নিত দোসরদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে; গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম ও তৎপরতা নিষিদ্ধ করতে হবে। আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর নামে কটূক্তি ও বিষোদ্গার বন্ধে কঠোর আইন করতে হবে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ধর্মীয় অবমাননা সংক্রান্ত শাস্তির আইনি ধারাগুলো বাদ দেয়ার সুপারিশ বাতিল করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। চট্টগ্রামে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে শহীদ সাইফুল ইসলাম হত্যার উসকানিদাতা চিন্ময় দাসের জামিন প্রত্যাহারপূর্বক তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে সারা দেশে প্রতিবাদী আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও ইসলামমনা তরুণদের বিরুদ্ধে হওয়া মিথ্যা ও বানোয়াট সব মামলা অতিসত্ত্বর প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারকে। সেই সঙ্গে জঙ্গি নাটক বা জঙ্গি কার্ড খেলে বাংলাদেশকে ইসলামপন্থী ও আলেম-ওলামাদের গত ১৫ বছর যারা নির্যাতন চালিয়েছিল, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
হেফাজতের নায়েবে আমির বলেন, ‘গাজার মুসলমানদের ওপর অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েলের চলমান গণহত্যা ও ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম নির্যাতনের প্রতিবাদে আমাদের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই সরকারকে কূটনৈতিকভাবে আরো উচ্চকণ্ঠ হতে হবে এবং দেশের সর্বস্তরের জনতাকে ইসরায়েলি ভারতীয় পণ্য বয়কট করতে হবে। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ। শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সবপর্যায়ে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘রাখাইনকে মানবিক করিডর প্রদানে সরকারের সম্মত হওয়া সম্পূর্ণরূপে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমাদের ভৌগোলিক নিরাপত্তার স্বার্থে এ অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে অবশ্যই অনতিবিলম্বে ফিরে আসতে হবে। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ভিনদেশী মিশনারি অপতৎপরতা ও দৌরাত্ম্য বন্ধে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতায় ও নিরাপত্তা সংকট কমাতে আলেম সমাজের দাওয়াতি কার্যক্রম আরো নিরাপদ ও সুযোগ করে দিতে হবে। সেখানে সামরিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো বৃদ্ধি করা ছাড়াও পাহাড়ি ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থিতিশীলতা বিনির্মাণে রাষ্ট্রীয় তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে এবং কাদিয়ানীদের বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সাধারণ মুসলমানদের ঈমান-আকিদা রক্ষার্থে কাদিয়ানীদের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।’
সমাবেশে চার দফা দাবিতে পুনরায় কর্মসূচি ঘোষণা করেন হেফাজতের মহাসচিব সাজিদুর রহমান। তিনি বলেন, নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিন মাসের মধ্যে বিভাগীয় সম্মেলন করা হবে। ২৩ মে বাদ জুমা বিক্ষোভ মিছিল করা হবে।
এ সময় হেফাজত ইসলামের নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও মুফতি কেফায়েত উল্লাহ আজহারীর সঞ্চালনায় নেতাকর্মীরা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।