কক্সবাজারের ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটির কোনো অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষকে সতর্কও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কতা আমলে নেয়া হয়নি। রিসোর্টে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নিচতলায় রান্নাঘর এবং ওপরের অংশে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সমুদ্রের একেবারে পাশে অবস্থান হওয়ায় প্রবল বাতাসে আগুন দ্রুত পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে।
গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, রিসোর্টটি থেকে অন্তত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরো ছয়জন আহত হয়েছেন। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টটি প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।
গতকাল দুপুরে রাজধানীতে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের কোনো অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গত জুনেই প্রতিষ্ঠানটিকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘তিনতলা কাঠের তৈরি রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ, যেখানে খাবার তৈরি করা হতো। দোতলা ও তিনতলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। ফায়ার সার্ভিসের তদারকির আওতায় প্রয়োজনীয় সনদও তাদের ছিল না। নিয়মতান্ত্রিকভাবে রিসোর্টটি পরিচালনা করা হচ্ছিল না।’
গতকাল বেলা সোয়া ২টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, রিসোর্টটি থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে প্রথমে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরো একজনের মরদেহ পাওয়া যায়। বেলা ১টার পর টয়লেট থেকে আরো চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে জানান, সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়া হয়। খবর দেয়ার কিছুক্ষণ আগেই আগুনের সূত্রপাত হয়। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তিনি বলেন, ‘সমুদ্রের তীব্র বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রিসোর্টটিতে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোসপাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না।’
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের। তারা হলেন চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত একটি ওষুধ কোম্পানির জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)। বাকিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, এর মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন সদস্য হতে পারে। তবে ডিএনএ রিপোর্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
এছাড়া এ ঘটনায় আহত হয়েছেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অন্য একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘হঠাৎ দরজা খুলে দেখি, ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে আমি ও আমার স্ত্রী পাশের নালায় লাফ দিয়ে বের হয়ে আসি।’ তিনি জানান, রিসোর্টটিতে ২৫-৩০ জন পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার মিরপুর থেকে বেড়াতে এসে তিনি ওই রিসোর্টে উঠেছিলেন। সেখানে আরো দুইদিন থাকার কথা ছিল তাদের।
টুপটুপ রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন দাবি করেন, প্রাথমিকভাবে তারা ধারণা করছেন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার পর পরই আমরা তা নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এর মধ্যেই রিসোর্টের এসি ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন দ্রুত পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে।’
তবে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে জেলা প্রশাসন। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।