নাগরিকদের নগর সেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজবাড়ী পৌরসভা। তখন প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল টাউন কমিটি। ১৯২৩ সালে এর নাম হয় রাজবাড়ী মিউনিসিপ্যালিটি। ১৯৭২ সালে রাজবাড়ী পৌরসভা নামকরণ হয়। ১৯৯১ সালে প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় উন্নীত হয়। এরপর তিন দশক পার হলেও সে অনুপাতে গড়ে ওঠেনি আধুনিক অবকাঠামো। পৌরসভার সড়কগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের মূল ড্রেনের বেশির ভাগ স্থানে ঢাকনা নেই। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গড়ে ওঠেনি। জায়গায় জায়গায় স্তূপ করে রাখা হচ্ছে আবর্জনা। মশক নিধনে ১৮টি ফগার মেশিন থাকলেও ১৬টিই নষ্ট। নালায় জমে থাকা পানিতে মশার বংশ বিস্তার বাড়লেও ১০ মাস ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে নিধন কার্যক্রম। এতে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ।
রাজবাড়ীর সদর হাসপাতালের তথ্য বলছে, জুলাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিল ৩৮ জন। আগস্টে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ জনে।
প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা গঠনের শর্তানুযায়ী, পৌর এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, শিল্প এলাকা ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। এছাড়া সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। সর্বোপরি নির্দিষ্ট জনসংখ্যা ও উন্নত অবকাঠামো থাকতে হয়।
বাসিন্দারা বলছেন, পৌরসভার বেশির ভাগ সড়কই ভাঙা। ড্রেনের ঢাকনা নেই। যত্রতত্র ফেলে রাখা হয় আবর্জনা, যা থেকে জন্ম নিচ্ছে মশা-মাছি। চলতি বছর ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু। প্রতিটি উপজেলার পাশাপাশি জেলা শহরে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।
পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এক বছর ধরে পৌর কর্তৃপক্ষ মশা নিধনে স্প্রে করেনি। একদিকে মশার উৎপাত, অন্যদিকে ড্রেনের পানির দুর্গন্ধে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে পৌরসভার বেশির ভাগ এলাকা।’
সালমান হোসেন নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘শহরের প্রধান সড়কের পাশেই ফেলে রাখা হয় ময়লা-আবর্জনা। কোনোদিন একবার আবার কোনোদিন পরিষ্কার করা হয় না। এ কারণে শহরে প্রবেশ করতে হয় নাকে কাপড় দিয়ে।’
বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা সুজন বিষ্ণু বলেন, ‘আগে মাঝে মধ্যেই পৌরসভা কর্তৃপক্ষ স্প্রে করত। এক বছর ধরে ফগার মেশিনের শব্দ পাওয়া যায় না। বিনোদপুরের বিবেকানান্দপল্লী এলাকায় গন্ধে যাওয়া যায় না। আবার শহরের খাদ্যগুদামের সামনেও থাকে আবর্জনার স্তূপ।’
পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বলছে, বৃষ্টিতে সদর হাসপাতাল রোড, এতিমখানা রোডসহ আরো কয়েকটি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সদর হাসপাতাল রোড ১৬৭৫ মিটার, পান্না চত্বর থেকে তালতলা পর্যন্ত ২১২০ মিটার এবং ২ নম্বর রেলগেট থেকে এতিমখানা রোড সংস্কারের জন্য ওয়ান ব্যাংকের প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংকপাড়া এলাকা দিয়ে চলে যাওয়া পানি নিষ্কাশনের মূল ড্রেন বেহাল। বেশির ভাগ স্থানে নেই ঢাকনা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে আবর্জনা। শুধু ব্যাংকপাড়া নয়, শহরের বেশির ভাগ সড়কের পাশ দিয়েই যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে আবর্জনা। নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার জন্য পৌরসভার ১৮টি পিকআপ থাকলেও সব নষ্ট।
অবশ্য মশক নিধন কার্যক্রমে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তায়েব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পৌরসভার অর্থনৈতিক সংকট নেই। দিন দিন ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ১০ মাস ধরে মশক নিধনে ব্যবহৃত ওষুধও নেই। নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বর্জ্য পরিবহনের পিকআপ।’
এদিকে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে ডেঙ্গু রোগী। সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, জুলাইয়ে ৩৮ জন আক্রান্ত হলেও আগস্টে তা দাঁড়িয়েছে ৬০ জনে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার কথা বলছেন চিকিৎসকরা।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এসএমএ হান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশেই মশার উৎপাত বেড়েছে। ডেঙ্গুর প্রকোপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই দুই থেকে তিনজন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অনেকে আবার নির্দেশনা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমরা রোগীদের বেশি তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। তবে জ্বর-সর্দি-কাশি হলে আতঙ্কিত না হয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’
রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদ বলেন, ‘ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সচেতন থাকতে বলা হয়েছে।’