আমদানি শুল্কের পর নির্মাণ শিল্পে ভ্যাটের খড়গ

নির্মাণ শিল্পের বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক (আমদানি, সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক) বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্য সংযোজন করও (মূসক বা ভ্যাট) বাড়ছে।

এটিকে বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ খাতের বেশকিছু দরকারি পণ্যে শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া সুতার ওপর ভ্যাট বসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ প্রস্তাব করেছে।

সিমেন্ট তৈরির মূল উপকরণ ক্লিংকারের শুল্কায়ন হয় নির্ধারিত মূল্যে। বর্তমানে প্রতি টনে ৭০০-৯৫০ টাকা কাস্টমস শুল্ক আছে। তবে এখন বাজারমূল্যে নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে কাস্টমস শুল্ক ধরা হয়েছে ১৫-২৫ শতাংশ। ডলারের ঊর্ধ্বমুখী দর ও বাজারের ওঠানামায় ব্যয়বহুল হতে পারে সিমেন্ট। রড, বার ও অ্যাঙ্গেল তৈরির কাঁচামালের ওপর বসানো হয়েছে বাড়তি শুল্কের বোঝা। বিভিন্ন ধরনের স্ক্রু, নাট ও বোল্ট কিনতে গেলে প্রায় তিন গুণ অর্থ ব্যয় করতে হবে। এসব পণ্যে মোট করভার ৩৭ থেকে বাড়িয়ে ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ করা হয়েছে। টাইলস ও নির্মাণসামগ্রীর মূল উপকরণ মার্বেল ও গ্রানাইট বোল্টারের সম্পূরক শুল্ক ২০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা হচ্ছে। ফলে এর মোট করভার ৮৯ দশমিক ৩২ থেকে বেড়ে হচ্ছে ১২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ।

স্থানীয় শিল্প অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে—এ অজুহাতে জিপসাম বোর্ড ও শিট আমদানিতে দ্বিগুণ করা হয়েছে সম্পূরক শুল্ক। এখন শুল্কহার হবে ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে সেবা পর্যায়ে মূসক হারও বাড়ছে। নির্মাণ সংস্থার জন্য বিদ্যমান মূসক হার সাড়ে ৭ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে।

বাড়ছে উৎপাদন পর্যায়ে মূসকের হারও। এমএস প্রডাক্ট খাতে আমদানি বা স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ থেকে তৈরি এমএস পণ্যে প্রতি টনে বিদ্যমান মূসক ১ হাজার ৪০০ বেড়ে ১ হাজার ৭০০ টাকা হচ্ছে। আমদানীকৃত বা স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে তৈরি সব ধরনের বিলেট ও ইনগট প্রতি টনের বিদ্যমান মূসক ১ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা হচ্ছে। বিলেট বা ইনগট থেকে তৈরি এমএস পণ্যে প্রতি টনে বিদ্যমান মূসক ১ হাজার ৩০০ বেড়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা হচ্ছে। গর্দা বা মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে তৈরি ইনগট বা বিলেট ও ইনগট বা বিলেট থেকে তৈরি এমএস পণ্যে মূসকের হার প্রতি টনে ২ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭০০ টাকা হচ্ছে। স্ক্র্যাপ বা শিপ স্ক্র্যাপে মূসক হার প্রতি টনে ১ হাজার থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা হচ্ছে।

তারকাঁটা, টোপ তারকাঁটা, বিভিন্ন সাইজের ও ধরনের স্ক্রু, গ্যালভানাইজড, নন-গ্যালভানাইজড, জিংক কোটিং, নিকেল কোটিং, অন্যান্য মেটাল কোটিং, কোটিং ছাড়া, জয়েন্ট (কানেক্টর), নাট, বোল্ট বিভিন্ন সাইজ ও ধরনের গ্যালভানাইজড, নন-গ্যালভানাইজড, জিংক কোটিং, নিকেল কোটিং, অন্যান্য মেটাল কোটিং, কোটিং ছাড়া, ইলেকট্রিক লাইন হার্ডওয়্যার এবং পোল ফিটিংস, যা এমএস ও স্টিল দিয়ে তৈরি (নাট, বোল্ট ছাড়া), স্টেইনলেস স্টিলের স্ট্রিপ থেকে তৈরি ব্লেড ও কার্বন স্টিলের স্ট্রিপ থেকে তৈরি ব্লেড—এসব পণ্যে বিদ্যমান মূসক হার ৫ থেকে বেড়ে সবগুলোয় সাড়ে ৭ শতাংশ হচ্ছে।

সেলফ কপি পেপার, ডুপ্লেক্স বোর্ড, কোটেড পেপার, প্লাস্টিকের তৈরি সব ধরনের টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, গৃহস্থালি সামগ্রী, হাইজেনিক ও টয়লেট সামগ্রীসহ এ ধরনের যেকোনো পণ্যে বিদ্যমান মূসক হার সাড়ে ৭ শতাংশ ও সিমেন্ট শিটে ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে সবগুলোতে ১৫ শতাংশ হচ্ছে।

কটন সুতা, ম্যান মেড ফাইবার ও অন্যান্য আঁশের সংমিশ্রণে তৈরি ইয়ার্নে প্রতি কেজিতে মূসক হার ৩ টাকা থেকে বেড়ে ৫ টাকা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সহসভাপতি সালেউদ জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যমান হারে মূসক দিয়েই তো আমাদের শিল্প বাঁচছে না। এখন আমাদের বায়ার পেতে সহযোগিতা দরকার, সেখানে আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ করে দেয়ার কাজ করা হচ্ছে। এটা কার স্বার্থে আমরা বুঝছি না। প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমাদের বলা হলো, আপনাদের দাবিগুলো বিবেচনায় নেয়া হবে। পরে সেটা রাখা হলো না। আমরা গত ছয় মাস যাদের সঙ্গে আলাপ করলাম, তারাই কি বাজেট তৈরি করেছেন, নাকি অন্য কেউ?’

স্থানীয় পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক খাতে আইসক্রিমের বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর। আমদানি পর্যায়ে আগাম কর (এটিভি) যৌক্তিক করা হচ্ছে। উৎপাদনকারীর জন্য বিদ্যমান এ হার ৩ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক আমদানিকারকের জন্য বিদ্যমান হার ৫ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্প আমদানিকারকদের জন্য আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম কর হ্রাস অবশ্যই একটি ভালো পদক্ষেপ। আমি মনে করি, ভ্যাট ও এসডি আইন, ২০১২ বাস্তবায়নের আগে যেমন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, দুই বছরের মধ্যে এটি ধীরে ধীরে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত। আমদানিকারকদের জন্য অগ্রিম কর (এটি) বৃদ্ধি করলে কোম্পানি ও ব্যক্তির খরচ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ অনুমিত মূল্য সংযোজন ৫০ শতাংশ হবে না। যদি নির্মাণ খাতের জন্য সিমেন্ট, ক্লিংকার ও অন্যান্য উপকরণের মতো ইনপুট খরচ বাড়ে, তবে এটি নির্মাণ সংস্থাগুলোর ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। উপরন্তু নির্মাণ ব্যয়ের ওপর ভ্যাট রিবেটযোগ্য নয়, যা সরকার ও জনগণ উভয়ের ব্যয় বৃদ্ধি করবে।’

আরও