সুরমার নদীর কুশিঘাট অংশে পলি জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে সিলেট নগরে বন্যা ও জলাবদ্ধতা স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিয়েছে। ২০২২ সালের মে ও জুনে নগরীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। চলতি মাসেও কয়েকবার জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০২৩ সালের ২১ জানুয়ারি শুরু হয় সুরমা নদী খনন। নগরীর কুশিঘাট থেকে লামাকাজি সেতু পর্যন্ত প্রথম দফায় প্রায় ১৮ কিলোমিটার নদী খননে ব্যয় ধরা হয় ৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি চলতি মাসেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে এসে কাজটি বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদী খননের বালি যেখানে ফেলা হচ্ছে, সেখানে জলাশয় রয়েছে। সিটি করপোরেশন সেখানে বালি ফেলতে নিষেধ করেছে। বিকল্প জায়গা না পেয়ে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, নগরীর একটি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে বালি ফেলা বন্ধ করা হয়েছে। আরো কিছু সংগঠনও অভিযোগ করেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বালি রাখা বন্ধ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। তিনি বলন, ‘যে কারণে খননকাজ বন্ধ করা হয়েছে, সেটি একটি অজুহাত মাত্র। কোনোভাবে মেনে নেয়ার মতো নয়।’
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে বন্যা, জলাবদ্ধতা স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে শহরের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ২০২২ সালের মে ও জুনে নগরীতে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। ওই সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সুরমা নদী খনন, শহররক্ষা বাঁধ এবং নদী ও ছড়া-খালের উৎসমুখে স্লুইস গেট নির্মাণের দাবি ওঠে। ওই সময় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীও নদী খননের ওপর জোর দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুরমা নদী খননে প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০২৩ সালের ২১ জানুয়ারি ৫০ কোটি টাকার খননকাজ উদ্বোধন করেন ড. একে আবদুল মোমেন। নগরীর কুশিঘাট থেকে লামাকাজি সেতু পর্যন্ত প্রথম দফায় প্রায় ১৮ কিলোমিটার নদী খননের কথা রয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয় ৫০ কোটি টাকা। ঢাকার গুডম্যান এবং কনফিডেন্স নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করছিল।
খননকাজ হঠাৎ কেন বন্ধ হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুশিঘাটে নদী খননের বালি যেখানে ফেলা হচ্ছে, সেটা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে সিসিক কর্তৃপক্ষ। বিকল্প জায়গা না পেয়ে কাজ বন্ধ রেখেছি। এরই মধ্যে ১৮ কিলোমিটারের মধ্যে ১২ কিলোমিটার খনন শেষ হওয়ার পথে। চলতি মাসে পুরো কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এছাড়া বর্তমানে নদীতে পানি পরিপূর্ণ। এ অবস্থায় খননকাজও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’
সুরমা নদীর যে স্থানে চর জেগে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতো ঠিক সে স্থানেই এসে খননকাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ৫০ কোটি টাকাই বিফলে যাবে। ফের অনিশ্চয়তাও দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। নদীতে পলি জমে পানিপ্রবাহ বাধা পাচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েক দফা প্লাবিত হয়েছে নগরী। বর্ষা মৌসুমে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।
পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমি সন্তান বাংলাদেশের সংগঠক শুয়াইব হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদী খননের পুরো ৫০ কোটি টাকাই গচ্চা যাবে। সুরমার যে জায়গাটিতে সবচেয়ে বেশি চর জেগে ওঠে, শুষ্ক মৌসুমে যেখানে হেঁটে পার হওয়া যায়, সে জায়গাটিতে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ওই জায়গাটি খনন না করলে বাকি ৮-১০ কিলোমিটার খনন করেও কাজে আসবে না। বিগত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে ঘন ঘন সিলেট শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। অল্প বৃষ্টি হলেই ডুবছে শহর। পাউবোর চলমান নদী খনন কার্যক্রম থমকে যাওয়ায় প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। খননকাজ সফলভাবে শেষ হলে চলতি মৌসুমেই এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ কুশিঘাটে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হলে বৃষ্টির পানি দ্রুত চলে যেত।’
কাজটি বন্ধ করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকেও দায়ী করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের অপারেশন ম্যানেজার আজিম উদ্দিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কাজ বন্ধের পেছনে পরিবেশ অধিদপ্তরও রয়েছে। তারা প্রথমে জলাশয় ভরাটের অভিযোগ তোলে। অথচ বালি ফেলার আগে কুশিঘাট মসজিদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে। তারা বলেছে, জায়গাটি মসজিদের। এরপর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কাজ বন্ধ রাখতে বলেছে।’
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা বলেন, ‘উত্তোলিত বালি সরকারি সম্পদ। যেখানে ফেলা হচ্ছে, পরে সেগুলো তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। অথচ বালি দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে বালি দিয়ে তার একটি জলাশয়ও ভরাট করে ফেলছে।’
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র মখলিছুর রহমান কামরান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে বালি ফেলা বন্ধ করা হয়েছে। এলাকাবাসীসহ আরো কিছু সংগঠনও অভিযোগ করেছে। তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বালি রাখা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কোনোভাবেই খননকাজ বন্ধ হতে দেব না। মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী যুক্তরাজ্যে আছেন, তিনি দেশে ফিরলেই বালি ফেলার বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করে খননকাজ শুরুর প্রচেষ্টা চালানো হবে।’