রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকার নাম বলতে গেলে প্রথমেই আসবে গুলশান, বনানী বা বারিধারার নাম। বসবাসের জন্য দেশের ধনী নাগরিকদের অন্যতম পছন্দ এসব এলাকা। ফলে এসব এলাকার অ্যাপার্টমেন্টের চাহিদা এবং দামও সর্বোচ্চ। আর সুযোগটি কাজে লাগাতে আশপাশের নিম্নাঞ্চল অপরিকল্পিতভাবে ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি আবাসন প্রকল্প। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এ এলাকার জল অসংবেদী ভূমির পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ। এ অবস্থায় যেকোনো উপায়ে গুলশান ও বনানী লেক সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ২০২২-৩৫ সালের জন্য প্রণীত ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ দুটি লেক সংরক্ষণ করা না গেলে অভিজাত এলাকাগুলো জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকিতে পড়বে।
বনানী, গুলশান ও বারিধারা আবাসিক এলাকা মূলত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭, ১৮ ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। বসুন্ধরা, খিলক্ষেত ও বাড্ডার কিছু অংশও এ এলাকার অন্তর্গত। শুরুতে আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিকল্পনা করা হলেও বর্তমানে এসব এলাকা মিশ্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ আবাসিক ব্যবহারের পাশাপাশি অফিস, বাণিজ্যিক ভবন, হোটেল, বিপণিবিতান, বিদেশী সংস্থার অফিস ইত্যাদির অবস্থান এখানে। এছাড়া এলাকার একটি অংশ বারিধারায় কয়েকটি বিদেশী দূতাবাস এবং প্রধান সড়কের পাশে বেশকিছু মিশ্র ব্যবহারবিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন রয়েছে।
রাজউকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অপরিকল্পিত বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের কারণে ভূমির প্রাকৃতিক ঢাল হ্রাস পেয়েছে। আবাসন প্রকল্পের ভরাটকৃত মাটি প্রধানত বেলে। এ মাটিতে অভিস্রবণের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হলেও ভূমির ঢাল হ্রাস পাওয়ায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে জলসংবেদী ভূমির পরিমাণ প্রায় ১৮ দশমিক ৫ এবং জল অসংবেদী ভূমির পরিমাণ প্রায় ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ। আবাসিক এবং মিশ্র ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনায় যে পরিমাণ উন্মুক্ত স্থান কিংবা সামাজিক সুবিধা থাকা প্রয়োজন—এ এলাকায় তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
বনানী ও গুলশান খাল দুটিকে এলাকার জন্য উল্লেখযোগ্য জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দুটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিকাংশ পানি হাতিরঝিল লেক এবং তা থেকে বেগুনবাড়ী খালে নিষ্কাশিত হয়। এছাড়া কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত সংযোগ সড়কের দুই পাশে ১০০ ফুট প্রশস্ত লেক নির্মাণ করা হচ্ছে। এগুলো এ এলাকার জলাধার হিসেবে কাজ করে। এ অঞ্চলের কিছু অংশ মধুপুর গড়ের অন্তর্গত। বাকি অংশ বন্যা অববাহিকা, নিম্নাঞ্চল ও জলাভূমির অন্তর্গত। বর্তমানে অধিকাংশ নিম্নাঞ্চলজুড়ে বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন প্রকল্প বিদ্যমান, যা জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুধু গুলশান-বনানী নয়, পরিকল্পিত এলাকা ধরলে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে বারিধারাসংলগ্ন এলাকা। যেকোনো স্থাপনায় সফট গ্রাউন্ড রাখা জরুরি, কারণ গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ না হলে সেখানে ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় প্রতি বছর প্রায় এক মিটার করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ঢাকার গ্রাউন্ড ওয়াটার পাম্পের একটি বড় অংশ অকেজো হয়ে গেছে।’
ঢাকা শহরে প্রচলিত ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যে পরিমাণ খোলা মাটির জায়গা রাখার দরকার বাস্তাবিকভাবে সে পরিমাণ রাখা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায়ও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। ঢাকা শহরের বিশেষ করে লিজ হোল্ড প্রপার্টির জমি যেগুলো বড় আকারের অর্থাৎ তিন কাঠা থেকে বেশি সেসব জমিতে ২০ শতাংশও সফট গ্রাউন্ডও পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ এখানে সফট গ্রাউন্ড থাকার কথা ছিল ৪০ শতাংশ। এ অঞ্চলগুলো কংক্রিটের আস্তরণে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।’
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় দেখানো হয়েছে যে বেসরকারি আবাসন প্রকল্প নিম্নাঞ্চল ভরাট করে গড়ে উঠেছে এবং এর ফলে ভূমির প্রাকৃতিক ঢাল কমেছে, যা জলাবদ্ধতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। ভূমি উন্নয়নের তল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ দশমিক ৫ মিটার। এ অঞ্চলের গড় বন্যার তল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ দশমিক ১ মিটার উঁচু। ফলে এখানে মানব নিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যেকোনো উপায়ে গুলশান এবং বনানী লেক সংরক্ষণ করতে হবে। গুলশান লেক, বনানী লেক এবং হাতিরঝিল লেকের এলাকায় জলাবদ্ধতা আছে। গুলশান, বনানী ও বারিধারা আবাসিক এলাকার জন্য পরিবহন, পরিবেশ, জনঘনত্ব এবং বাণিজ্যিক চাহিদা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রাজউকের তৈরি করা লেআউট পরিমার্জন প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি।
এক সময় কূটনৈতিকপাড়া হিসেবে পরিচিত ছিল গুলশান, বনানী ও বারিধারা। ফলে সেই সময়ও গুলশান ও তার আশপাশের জমি ছিল তুলনামূলক মূল্যবান, চাহিদাও ছিল সর্বোচ্চ। গুলশান ও এর আশপাশে এখন বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক ভবনের ছড়াছড়ি। এর কোনোটি আবাসিক প্লটকে রূপান্তর করে বাণিজ্যিক করা হয়েছে, আবার কোনোটি আবাসিক প্লটে অনুমতি ছাড়াই গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ভবন। সারি সারি সুউচ্চ ভবনে শপিং মল, কারখানা, রেস্টুরেন্ট মিলিয়ে একসময়ের শান্ত-স্নিগ্ধ সবুজ অভিজাত আবাসিক এলাকা তার স্বকীয়তা হারিয়েছে। ১৯৭৫ সালে গুলশানের এক কাঠা জমির দাম ছিল ২৫ হাজার টাকা। এখন সেখানে জমির দাম কাঠাপ্রতি ৩ থেকে ৫ কোটি টাকার মধ্যে। তবে মূল সড়কের পাশে বিশেষ করে গুলশান এভিনিউয়ে প্রতি কাঠা জমির দাম ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। জমি কেনার প্রতিযোগিতায় রেহাই পায়নি নিম্নাঞ্চল। সেখানে অপরিকল্পিতভাবেই ভরাট হচ্ছে ভূমি, গড়ে উঠছে নিত্যনতুন ভবন।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘একটি শহরের পরিকল্পনা অনেক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে করা হয়। কিন্তু যখন আবাসিক প্লটের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয় তখন সেটি আর পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারে না। কিন্তু এসব অভিজাত এলাকায় অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন চাপে নত হয়ে বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন দেয়া হয়। নীতিনির্ধারক কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা-দুর্বলতায় বছরের পর বছর ধরে এসব অনিয়ম হয়ে আসছে।’
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ২০০৪ সালে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে গুলশানের বেশকিছু এলাকাকে বাণিজ্যিক হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে রাজধানীর কিছু আবাসিক এলাকার প্লটের বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ ছিল। গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোর জন্য কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ টাকা ফি দিয়ে প্লটগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় যথেচ্ছভাবে অনুমোদন দেয়া হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত এসব এলাকায় প্লট বাণিজ্যিকীকরণের অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
বিষয়টি নিয়ে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ও শামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর শামসুল আলামিন জানান, গুলশান, বনানী এ এলাকায় প্রথম প্রজন্মের অধিবাসীরা জমি বরাদ্দ পেয়ে বাড়ি করে বসবাস শুরু করেন। তাদের ছেলেমেয়েরা এখানেই বড় হয়েছে। তারা গুলশান-বনানীর মতো পরিকল্পিত এলাকা ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। জমির স্বল্পতা রয়েছে। কিন্তু মানুষ বাড়ছে। এ কারণে এই এলাকায় জমির চাহিদা তুলনামূলক বেশি। জমির চাহিদা বেশি, দামও বেশি ফলে সেসব জমি ডেভেলপার কোম্পানির কাছে দেয়া হয়। আবার এখানে যেহেতু বাণিজ্যিক ভবন তৈরির সুযোগ আছে, অনেকে সে সুযোগও কাজে লাগাচ্ছেন।