ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে খাদ্য উৎপাদন বাড়েনি চট্টগ্রামে

ঘাটতি পূরণে বাইরের জেলার ওপর নির্ভরতায় বাড়ছে দাম

চট্টগ্রামে স্থানীয় উৎপাদনের তুলনায় ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যের চাহিদা বেশি থাকায় প্রতি বছরই বাড়ছে ঘাটতি।

চট্টগ্রামে স্থানীয় উৎপাদনের তুলনায় ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যের চাহিদা বেশি থাকায় প্রতি বছরই বাড়ছে ঘাটতি। চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলার মোট খাদ্যের চাহিদার অর্ধেক স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি খাদ্যপণ্য সরবরাহ করতে হয় বাইরের জেলা থেকে। গত ১৭ বছরে জেলার জনসংখ্যা বেড়েছে ৩২ লাখের বেশি। তবে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে মাত্র এক লাখ টনের মতো। প্রতি বছরই ঘাটতির কারণে বাইরের বাজারের ওপর বেড়েছে নির্ভরশীলতা। বাইরের জেলা থেকে খাদ্য আনতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এর প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্যের দামে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে চালসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সব সময়ই বেশি। খাদ্য ঘাটতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলা থেকে চাল, গম, সবজি, ডিমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পরিবহন খরচের পাশাপাশি কমিশন এজেন্টদের কারণে অন্যান্য জেলার চেয়ে বেশি দামে খাদ্য সংগ্রহ করতে হয় চট্টগ্রামের মানুষকে। বাড়তি দামে খাদ্য সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে ভোক্তারা। বর্তমান পরিস্থিতি খাদ্য ঘাটতি আরো বাড়াবে। আগামীতে এ অঞ্চলে খাদ্য নিয়ে আরো বড় সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের চট্টগ্রাম জেলা ছাড়াও ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও রাঙ্গামাটিতে ৪৬-৯১ শতাংশ পর্যন্ত চালের ঘাটতি রয়েছে। চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও নোয়াখালীতে ১-১৮ শতাংশ পর্যন্ত চাল উদ্বৃত্ত থাকে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে কক্সবাজার জেলায় আগে খাদ্যের ঘাটতি না থাকলেও ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে খাদ্য ঘাটতি বেড়েছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে জেলায় খাদ্য গ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৬২ লাখ ৩৩ হাজার ১৬০। এ জনগোষ্ঠীর দানাদার খাদ্যের (চাল, গম ও ভুট্টা) চাহিদা ছিল ১০ লাখ ৩২ হাজার টন। অবচয় বাদে খাদ্য উৎপাদন হয় ৭ লাখ ২০ হাজার টন। অর্থাৎ সে সময়ে খাদ্য ঘাটতি ছিল ৩ লাখ ১২ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ লাখ ১৫ হাজার জনে। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদা রয়েছে ১৬ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ টন। তবে উৎপাদন হয়েছে ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৫ টন। সে হিসাবে ঘাটতি রয়েছে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৮ টন। অর্থাৎ ভোক্তা পর্যায়ে মোট চাহিদার ৪৮ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে স্থানীয় কৃষিজমিতে। বাকি ৫২ শতাংশ অন্যান্য জেলা থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

বিগত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খাদ্যের চাহিদা ১২ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৮ টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬৮ টন। ঘাটতি ছিল ৫ লাখ ১৬ হাজার টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খাদ্যের চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৩৩ হাজার ৬৬৫ টনে। উৎপাদনও কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৭ টনে। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি পড়ে ৬ লাখ ৯১ হাজার ৮২৮ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৪ লাখ ৪৯ হাজার ৭২২ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮৮ টন। ঘাটতি ছিল ৭ লাখ ১০ হাজার ৮৩৪ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে খাদ্যের চাহিদা দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৯৫৮ টনে। বিপরীতে উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫৭ টন। ঘাটতি ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার ৪০১ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪ লাখ ৮৫ হাজার ৮৯৮ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৪২ হাজার ৩৪০ টন। ঘাটতি পড়ে ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৮ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে খাদ্যের চাহিদা ছিল ১৪ লাখ ৯৬ হাজার টন। ওই বছর উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫ টন। ঘাটতি ছিল ৭ লাখ ১৭ হাজার ৯৪৫ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চাহিদা দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৫৫ হাজার টনে। বিপরীতে উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৩০ হাজার টন। সে হিসাবে ঘাটতি পড়ে ৭ লাখ ২৫ হাজার টন। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খাদ্যের চাহিদা ছিল ১৬ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ টন। তবে উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৫ টন। চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৭ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৮ টন।

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের অন্যান্য জেলার মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নোয়াখালীতে খাদ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৩ লাখ ৮ হাজার ৫৩৭ টন। ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলায়ও খাদ্য উদ্বৃত্ত ছিল যথাক্রমে ৪৪ হাজার ও ৭৫ হাজার ৩২৯ টন। বিগত বছরের পরিসংখ্যানেও এ তিন জেলায় খাদ্য উদ্বৃত্ত ছিল। মূলত আমন, আউশ, বোরো, গম ও ভুট্টা—এ পাঁচ ধরনের দানাদার খাদ্যকেই খাদ্যশস্যের পরিসংখ্যানে যুক্ত করা হয়। তবে এ খাদ্যের বাইরে ডালজাতীয় ফসল, বিভিন্ন ধরনের সবজির উৎপাদনও অনেক কম। সে হিসেবে চট্টগ্রামে খাদ্য সংকট নিরসনে অন্যান্য জেলার ওপর করতে হয়।

চট্টগ্রামে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ওমর আজম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কৃষিভিত্তিক অঞ্চল নয়। দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের জেলা থেকে চাল, ডাল, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করা হয় এখানে। সেখানকার বাজার থেকে কেনা পণ্য চট্টগ্রামের বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। যেমন দিনাজপুর ও পঞ্চগড় থেকে চাল যদি ৬০-৭০ টাকায় পাইকারি ক্রয় করা হয়, এখানে সেটা ৭০-৮০ বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। পরিবহন খরচ ছাড়াও আনুষঙ্গিক খরচও বাড়তি। এসব কারণে চট্টগ্রামে চালের দাম দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি। অতিরিক্ত খরচ ভোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, শিল্পকেন্দ্রিক অঞ্চল হিসেবে চট্টগ্রামে কৃষি খাতের বিকাশ দিন দিন কমছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হওয়ায় এখানে কাজের সুযোগ ও উন্নত জীবনমানের আশায় প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ বসবাস শুরু করছে। ফলে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে, আর আবাসন ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কারণে উৎপাদনক্ষম কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন শিল্পাঞ্চল ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে জমি ব্যবহার হওয়ায় কৃষি আবাদ সীমিত হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যের চাহিদা যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি উৎপাদনক্ষম জমি হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদন ও চাহিদার ফারাক ক্রমেই বেড়ে গিয়ে খাদ্য ঘাটতি প্রকট হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (আঞ্চলিক) অতিরিক্ত পরিচালক মোহম্মদ আলী জিন্নাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী জেলা হওয়ায় চট্টগ্রামে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ কাজ ও উচ্চশিক্ষার জন্য আসে। কিন্তু কৃষিজমির পরিমাণ না বাড়ায় স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। তবুও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ফলে একই জমিতে আগের তুলনায় কয়েক গুণ ফসল ফলছে। তবে খাদ্য ঘাটতি থাকলেও সরবরাহ চেইন ঠিক থাকায় সংকটের আশঙ্কা নেই।’

আরও