২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিক ভালো যায়নি বেশির ভাগ বড় করপোরেট গ্রুপের

দেশে ডলারের বিনিময় হার গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ছিল ৮৫ থেকে ৮৬ টাকার মধ্যে। চলতি পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৬ থেকে ১০৭ টাকায়। তালিকাভুক্ত বড় করপোরেটগুলোর ব্যবসায়ও পড়েছে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির প্রভাব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতিতে বেড়েছে

দেশে ডলারের বিনিময় হার গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ছিল ৮৫ থেকে ৮৬ টাকার মধ্যে। চলতি পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৬ থেকে ১০৭ টাকায়। তালিকাভুক্ত বড় করপোরেটগুলোর ব্যবসায়ও পড়েছে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির প্রভাব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে টাকার অবমূল্যায়ন মূল্যস্ফীতিতে বেড়েছে কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় পণ্যের উৎপাদন খরচ। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়লেও নিট মুনাফা কমেছে টাকার অবমূল্যায়নে। কেউ কেউ লোকসানও গুনেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ডলারের বিনিময় হারে অস্থিরতা না কাটলে তা সামনের দিনগুলোয়ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় বড় প্রভাবক হিসেবে থেকে যাবে।

সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এতে দেখা যায় আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশ, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ, রানার অটোমোবাইলস, এসিআই লিমিটেড, এমজেএল বাংলাদেশ, বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, এপেক্স ফুটওয়্যার, মতিন স্পিনিং মিলস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার টেক্সটাইলস সামিট পাওয়ারের মতো বড় করপোরেটগুলোর সবার নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।

কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাঁচামাল আমদানিতে সবগুলো প্রতিষ্ঠানেরই ব্যয় আগের তুলনায় বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বেড়েছে পণ্য উৎপাদনের ব্যয়ও। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে কোম্পানিগুলোকে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়েছে।

বহুজাতিক কোম্পানি আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশ বছরের প্রথম তিন মাসে ২০০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ২০০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সময়ে কোম্পানিটির আয় কিছুটা বেড়েছে। তবে আয় বাড়লেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৩৫ দশমিক ৬২ শতাংশ কমে ১৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মুনাফা কমার কারণ হিসেবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, গ্যাসের অপর্যাপ্ততা, বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাবে সব ধরনের কাঁচামালের দাম জাহাজীকরণের ব্যয় বেড়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস হোম অ্যাপ্লায়েন্স উৎপাদক ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ বছরের প্রথম তিন মাসে হাজার ৫০২ কোটি ৯২ লাখ টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল হাজার ২০৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। সময়ে কোম্পানিটির আয় কমেছে ৩১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আয় কমার পাশাপাশি বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ কমে ২৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি জাহাজীকরণের ব্যয় বাড়ার কারণে মুনাফা কমেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

বছরের প্রথম তিন মাসে রানার অটোমোবাইলসের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ১৭৪ কোটি লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির ১৭ কোটি লাখ টাকা কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল। আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি কাঁচামালের দাম আর্থিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে রানার অটোমোবাইলসের মুনাফা কমে গেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

এসিআই লিমিটেড চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হাজার ৮৫১ কোটি ২০ লাখ টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল হাজার ৩৫৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ২১ শতাংশ। আয় বাড়লেও বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে কোটি ৯৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কোম্পানির ব্যয় বেড়েছে। কারণে নিট মুনাফা কমেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

এমজেএল বাংলাদেশের আয় বছরের প্রথম তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়ে ৮০৪ কোটি ১১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের তুলনায় দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা হয়েছে। বেক্সিমকো লিমিটেড চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হাজার ৮২৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল হাজার ৯৯১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। সময়ে কোম্পানিটির আয় কমেছে দশমিক ২৫ শতাংশ। বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে ১০৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস, বিদ্যুৎ জাহাজীকরণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের দাম ওঠানামার কারণে নিট মুনাফা কমেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের আয় বছরের প্রথম তিন মাসে এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে ৯৫৫ কোটি ৪২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের তুলনায় ১৫ দশমিক ১৮ শতাংশ কমে ৯০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে গ্রস মার্জিন কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে মুনাফা কমেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। এছাড়া আগের বছর অ্যাস্ট্রাজেনেকার কভিড-১৯ ভ্যাকসিন ডিস্ট্রিবিউশন ফি বাবদ আয় যোগ হয়েছিল কোম্পানিটির মুনাফায়। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে বছরের প্রথম তিন মাসে খাত থেকে কোনো আয় আসেনি। এটিও কোম্পানিটির মুনাফা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

এপেক্স ফুটওয়্যার বছরের প্রথম তিন মাসে ৩৬১ কোটি ২২ লাখ টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ২৮৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ২৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। আয় বাড়লেও বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৫৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে কোটি ২৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

মুনাফা কমার কারণ জানতে চাইলে এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বণিক বার্তাকে বলেন, বছরের ফেব্রুয়ারি মার্চে আমাদের পণ্য রফতানি কম হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি করা সিনথেটিক কাঁচামালের ব্যয় বেড়েছে। এতে সার্বিকভাবে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এসব কারণেই কোম্পানির নিট মুনাফা কমেছে।

মতিন স্পিনিং মিলসের আয় বছরের প্রথম তিন মাসে আগের বছরের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ১৬৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা সময়ে আগের তুলনায় ৯৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ কমে কোটি ১০ লাখ টাকা হয়েছে।

বিষয়ে মতিন স্পিনিং মিলসের কোম্পানি সচিব মো. শাহ আলম মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কাঁচামালের দামও বেড়ে গেছে। পাশাপাশি আমাদের ইউটিলিটি ব্যয়ও বেড়েছে। অন্যদিকে প্রস্তুতকৃত পণ্যের দাম বাড়েনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানির মুনাফা কমে গেছে। অবস্থায় ব্যয় কমাতে আমরা একটি সাব-স্টেশন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে করে আমাদের বছরে কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় সাশ্রয় হবে।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস বছরের প্রথম তিন মাসে হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল হাজার ৬৮৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে দশমিক ৫৮ শতাংশ। আয় বাড়লেও বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের তুলনায় দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে ৩৮৩ কোটি ৩২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

স্কয়ার টেক্সটাইলসের আয় বছরের প্রথম তিন মাসে আগের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে ৩১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা হয়েছে। সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৪৭ দশমিক ১৬ শতাংশ কমে ২৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

জানতে চাইলে স্কয়ার গ্রুপের হিসাব অর্থ বিভাগের প্রধান মো. কবীর রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, বছরের শুরুতে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কেনিয়া লাইফ সাইনস সাবসিডিয়ারির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অবচয় পরিচালন ব্যয়ের কারণে দুই সাবসিডিয়ারি সময়ে লোকসান করেছে। তাছাড়া ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কাঁচামাল বাবদ ব্যয় বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে কোম্পানির মুনাফার ওপর। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সুতার উৎপাদন কমে গেছে। পাশাপাশি গ্যাস ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে সুতার দামও কমে গেছে। এসব কারণে স্কয়ার টেক্সটাইলসের মুনাফা কমে গেছে।

দেশের সবচেয়ে বড় আইপিপি সামিট পাওয়ার বছরের প্রথম তিন মাসে হাজার ৫৫৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল হাজার ২৯১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ২০ দশমিক ৫২ শতাংশ। আয় বাড়লেও বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটিকে ১২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে ১৫৪ কোটি ১২ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছিল কোম্পানিটি।

লোকসানের কারণে জানতে চাইলে সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক ফয়সাল করিম খান বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) দেরিতে অর্থ পরিশোধ করায় বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় খাতে আমাদের লোকসান হয়েছে। বিপিডিবি ছয় মাস পর টাকা পরিশোধ করেছে। সময়ে টাকার উল্লেখযোগ্য হারে অবমূল্যায়ন হয়েছে। যদি আমরা সময়মতো টাকা পেতাম তাহলে এইচএফও আমদানির এলসি, ঋণ পরিশোধ স্পেয়ার পার্টস সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতি ডলার ৯০ টাকায় নিষ্পত্তি করতে পারতাম। কিন্তু দেরিতে টাকা দেয়ার কারণে ডলারের দাম ১০৬ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া দেরিতে অর্থ পরিশোধের কারণে আমাদের চলতি মূলধন বাবদ ব্যাংককে উচ্চ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এসব কারণেই সময়ে কোম্পানির লোকসান হয়েছে।

আরও